বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৫

প্রবাস জীবনের গল্প..

ব্লগ সম্পর্কে দেশের অধিকাংশ মানুষের কোন ধারণা না থাকলেও ব্লগারদের প্রতি তাদের ঘৃণার কোন কমতি নেই। আমি দেশ থেকে বের হওয়ার পরপরই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব অনেকের জানা হয়ে গেছে যে, ইতুও একটা নাস্তিক ব্লগার ছিলও। আমার আত্মীয়-স্বজনেরা এখন আমাদের বাসায় আসতে ভয় পায়, তারা এখন আমার সম্পর্কে আড়ালে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে পছন্দ করে।

আমি মিশুক স্বভাবের ছিলাম না, আমি কখনও বিকালে ছাদে উঠে প্রতিবেশীদের সাথে আড্ডা দিতে যাই নি, কোন প্রতিবেশীর বাসায় যাই নি। আমার সাথে কেউ কথা বললে তবেই আমি কথা বলতাম, নিজে থেকে কখনও কথা বলি নি। একদিন সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, একজন জিজ্ঞেস করল, ‘ইতু কেমন আছো?’ আমি বললাম, ‘আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না’। তারপর উনি আমার ছোট বোনের নাম বলে বললেন যে, তুমি ওর বোন না? আমি বললাম, হ্যা। তারপর বললেন, আমি তোমাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকি’। ‘ও আচ্ছা, আমি ভালো আছি’ এইটুকু বলেই আমি চলে গেলাম। আমি অসামাজিক ছিলাম। অথচ আমার মা-বাবা-বোন আমার সম্পূর্ণ বিপরীত। পাশের বাসার বাচ্চাটাকে দেখলেই বাবা আদর করতেন, তার সাথে শিশুতোষ কথা বলতেন। মা সবসময় আশেপাশের সবার খোঁজখবর রাখতেন। আমি দেশ ছাড়ার পর আমার প্রতিবেশীরাও জানতে পারলেন যে, আমি নাস্তিক ব্লগার ছিলাম। তারা এখন আমার বাবা-মা’কে আড়চোখে দেখে। 

আমার স্কুলের টিচার্স টেবিলে আমাকে নিয়ে আলোচনা উঠেছে। আমার একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষিকার মতে, ‘আরে ওকে আমি চিনি, ফাজিল একটা। বড় বড় ব্লগারদেরকে মারার জন্য লিস্ট করছে, ওর মতো চুনোপুঁটি আবার কিসের ব্লগার? সব নাটক’। টিচারের এই কথাও আমার কানে চলে এলো। আমি তো পুরাই ‘বেয়াক্কেল’ হয়ে গেলাম। আমার এক বন্ধু বলল, ‘এই টিচাররে তো স্যালুট দেয়া দরকার। সাধারণ স্যালুটে কাজ হবে না। এক্কেরে পতাকার বাঁশের লগে বাইন্ধ্যা বাঁশটা ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া উনারা স্যালুট দেয়া দরকার’। আমি ব্যাপার গুলোকে হাস্যকর ভাবে নিলেও, আমার মা-বাবা এসবে কষ্ট পান। আমার মা-বাবা যারা কিনা রাতদিন আমার জন্য চোখের পানি ফেলেন, তাদের কানে যখন এসব কথা যায় তখন তারা নিজেদেরকে আরও অসহায় ভাবতে শুরু করেন।

কলেজের স্যারেরা শুনেছি আমার ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে, অনুভূতিতে আঘাত দেয়া ঠিক না, এই জাতীয় কথাবার্তা বলেছেন। একের পর এক ব্লগার হত্যায় নিশ্চয়ই তাদের কারও অনুভূতিতে আঘাত লাগে নি। 

আত্মীয়-স্বজন-প্রতিবেশীরা আমার পরিবারের সাথে দূরত্ব রেখে চললেও আমার বাবার এক বন্ধু যার বাসায় আমি বেশ কয়েকদিন লুকিয়ে ছিলাম, সেই বন্ধু ও বন্ধুর পরিবারের সদস্যরা আমার খোঁজ নেন সবসময়। আমার বাবা-মা’কে সাহস দেন।
আমার বন্ধুরাও আমাকে ভুলে নি, আমাকে সবসময় ফেইসবুকে তাদের জীবনের খবর জানায়, আমি থাকলে আরও কি কি হতে পারতো, সেসব বলে। 

এখানেই আত্মীয় আর বন্ধুদের মধ্যে পার্থক্য। আত্মীয় হল তারা যাদের সাথে রক্তের সম্পর্ক আছে বলে জোর করে আত্মীয়তা রাখতে হয়। আর বন্ধু তো বন্ধুই। বন্ধুত্বের কোন সংজ্ঞা হয় না।

মাঝেমাঝে মনে হয় কোন দুঃখে যে লেখালেখি করতে গিয়েছিলাম! স্বাধীনতার কোন কমতি ছিলও না আমার জীবনে। লিখতে গিয়ে বরং আমি আমার স্বাধীন জীবনটাকে হারিয়েছি। মেয়েদের সাধারণত কোথাও বের হতে গেলে, বাসায় ম্যানেজ করার একটা ব্যাপার থাকলেও আমার সেটা কখনোই ছিলও না। যখন তখন বের হতাম, আড্ডা দিতাম, ঘুরে বেড়াতাম, বাবা-মায়ের বকুনি’কে পাত্তা দিই নি কখনও।

জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ফলো করা শুরু হল, তখন থেকে কলেজ আর বাসা ছাড়া আর সব জায়গায় যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলও। ঠিকমত কলেজে পৌঁছালাম কিনা- এই নিয়ে বাবা-মা’র চিন্তার শেষ ছিল না। বন্ধুরা কোথাও বের হওয়ার কথা বললে এড়িয়ে যেতাম। বন্ধুরা সবাই বলতো, ‘ইতু বদলে গেছে, আগে তো এমন ছিলি না’। স্কুলের বন্ধুরা ভাবতো আমি কলেজে গিয়ে স্কুলের বন্ধুদের অবহেলা করছি। আর কলেজের বন্ধুরা ভাবতো, আমার কাছে স্কুলের বন্ধুরাই সব, কলেজের বন্ধুরা কিছুই না। কিন্তু আমার করার কিছুই ছিলও না। কাউকে কিছু বলতে পারতাম না। এসব কথা বাবা-মা আর ফেইসবুকের কিছু প্রিয় বন্ধু ছাড়া আর কেউ জানতো না। বাবা-মা’কে এইরকম চিন্তায় ফেলেছি বলে নিজেকে অপরাধী মনে হতো, এরমধ্যে বাবা যেদিন বললেন, ‘আমাদের অপরাধ, আমরা তোমার বাবা-মা’। সেদিন থেকে কারও সাথে এ নিয়ে একটি কথাও বলি নি। 

ভেবেছিলাম, শীঘ্রই দেশের পরিস্থিতি ভালো হবে। হাসিনা সরকার নিশ্চয়ই ব্লগার হত্যাকারীদের শনাক্ত করে শাস্তির ব্যবস্থা করবে, আর কাউকে ব্লগে লিখার জন্য চাপাতির কোপে মৃত্যুবরণ করতে হবে না। প্রতিমুহুর্তে ভাবতাম, খুব তাড়াতাড়ি আমি আগের সেই স্বাধীন জীবণে ফিরে যাবো। কিন্তু আমার ভাবনা দিয়ে কি আর রাজনীতি চলে? রাজনীতি চলে ভোট দিয়ে। কাজেই নাস্তিক হত্যার বিচার করে কে-ই-বা ভোট হারাতে চায়? সরকারের কাছে দেশে ঘটে যাওয়া সবধরনের অপরাধগুলো কেবলই বিছিন্ন ঘটনা মাত্র। নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, প্রশ্ন ফাঁস, একের পর এক ব্লগার হত্যা, বিদেশী নাগরিক হত্যা এসব ঘটনা সরকারকে মোটেই বিব্রত করে না। বিব্রত করে শুধু ব্লগাররা, যারা এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। জঙ্গিরা ব্লগারদের মেরে ফেলার হিট লিস্ট বানায়, আর সরকার বিব্রতকারী ব্লগারদের লিস্ট বানায়, ৫৭ধারায় গ্রেফতারের জন্য! 

অবস্থার কোন পরিবর্তন নেই। আত্মীয়স্বজন বাবা-মা’কে ফোন করে বলতে শুরু করেন, আপনার মেয়েকে থামান, এই মেয়েকে তো বেশিদিন ঘরে রাখা যাবে না, কিসব লিখে সে? বাবা-মা ঠিক করলেন, ইন্টারটা শেষ করে দেশের বাইরে কোথাও পাঠিয়ে দিবেন। যদিও দেশের বাইরে যাওয়ার ব্যাপারটা আমি সিরিয়াসলি নিতাম না। এর আগে ২০১০ সালে, তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়তাম। ব্রিটিশ কাউন্সিলের একটা প্রজেক্টে অংশ নিয়েছিলাম, সেখানে নাটকে
প্রথম হয়ে আমি সহ বাংলাদেশ থেকে আমরা পাঁচজন ইংল্যান্ড গিয়েছিলাম দশ দিনের জন্য। যদিও বন্ধুদের সাথে মজা করেই দিন কাটছিলও তবুও ইংল্যান্ডে পা রেখেই আমরা প্রত্যেকেই দেশকে প্রচন্ডভাবে মিস করতে লাগলাম। দেশে বসে দেশের যতই সমালোচনা করি না কেন, দেশ যে কি, সেটা তখনই বুঝেছিলাম। কাজেই দেশের বাইরে যাওয়াটা আমার কাছে তখন থেকেই প্রচন্ড আতংকের মত ছিলও।

কিন্তু এরমধ্যেই ফলোর মাত্র বেড়ে গেলও, বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে গিয়ে আমার ফলোয়ারেরা আমার সম্পর্কে তথ্য চাইতে লাগলো, আর বন্ধুরা ফোন করে জানাতে লাগলো যে আমাকে খুঁজতে নাকি কারা যেন কোচিং এ যায়। না, আমি এসব আর কাউকে বলার প্রয়োজন মনে করি নি, কারণ আমি জানি এসব বলে কেবলই চিন্তা বাড়বে, আমাদের কারোর কিছুই করার ক্ষমতা নেই। কিন্তু কোন এক কোচিং এ গিয়ে আমার ফলোয়ারেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিল, ‘এই মাসের মধ্যেই ইনশাল্লাহ …….’ তাদের এই কথা আমার এক বন্ধু শুনে সাথে সাথে বাসায় ফোন করে, তখন আমি বাসায় স্যারের কাছে পড়ছিলাম বলে ফোনটা বাবা ধরে। বাবা সব জানতে পেরে ওইদিন আমাকে রাতের আঁধারে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেয়। দুইটা প্যান্ট, আর দুইটা টি’শার্ট নিয়ে ৯ আগস্ট রাত ১২টার দিকে বাসা থেকে বেড়িয়ে যাই, তখনও ভাবি নি যে আর কখনও আমি ঘরে ফিরতে পারব না। আমার কাছে এসব এখনও স্বপ্ন বলে মনে হয়। এখনও সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ খুলে আমাকে কয়েক মিনিট ভাবতে হয়, ‘আমি কোথায় আছি’।

বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার এক নিউজে দেখলাম ব্লগাররা নাকি পলিটিক্যাল এসাইলাম নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে মিথ্যা নাটক করছে। শুনে হাসি পেলো, নিজের বাবা-মা-ভাই-বোন-প্রিয় বন্ধুদের ছেড়ে কেউ বুঝে স্বেচ্ছায় একা-সম্পূর্ন অচেনা পরিবেশে, নিষ্ঠুর একটি জীবন বেছে নেয়? এমন পাগলও আছে নাকি? প্রবাসী ব্লগারদের কেউ কেউ দেশে গিয়ে পুকুরে মাছ ধরার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে, পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানের আড্ডার সময়গুলোর কথা ভেবে চোখের জল মুছে।

দেশের অনেকের ধারণা প্রবাসী ব্লগার
রা ডলার-পাউন্ডের উপর শুয়ে শুয়ে ব্লগ লিখছে। ‘বিদেশ’ কি জিনিস সে সম্পর্কে যাদের ধারণা নেই তারাই এধরণের কিছু ভাবতে পারে। প্রবাসী ব্লগারেরা এখানে দিনের ১২ ঘন্টা ব্যয় করে জীবিকা নির্বাহের অর্থ জোগাতে, দিন শেষে ক্লান্ত হয়ে রুমে ফিরে কারও কারও ভাগ্যে ঘুমের জন্য বিছানাটুকু জোটে না। অনেকেই লেখালেখি ভুলে গিয়ে জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। 

দেশে ব্লগারদের মৃত্যু ভয় নিয়ে বাঁচতে হয় আর প্রবাসী ব্লগারেরা প্রতিমুহুর্তে মৃতের মত বাঁচে। ভয়াবহ একাকীত্বে প্রতিমুহুর্তে তাদের মৃত্যু হয়। বন্ধুদের সাথে রাস্তার মোড়ে নালার পাশে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে দিতেই কখন বিকাল থেকে সন্ধ্যা হয়ে যেতো টের পেতাম না। আর এখন উন্নতদেশের বড় বড় বিল্ডিং আর পার্ক গুলো দেখলেও আমার কোন ধরণের ভালো লাগা তো দূরে থাক, একবার ঘুরে দেখতেও ইচ্ছা হয় না। ভালো লাগা, খারাপ লাগা কোন ধরণের অনুভুতিই কাজ করে না। অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে গেছে। বাবা-মায়ের কাছে দেশে ফিরে যাওয়ার কথা বললে, তাঁরা আঁতকে উঠে। জিজ্ঞেস করে, মাথায় সমস্যা আছে কিনা! আগে আমার অনেক চাহিদা ছিলও, বাবা-মায়ের কাছে এটাওটা কিনে দেয়ার বায়না ধরতাম, এখন আমার একটাই চাহিদা, যদি একবারের জন্য দেশে ফিরতে পারতাম।


শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৫

মূর্তি ভাঙলে ভগবানের অক্ষমতা প্রমাণ পায়, আর মসজিদ ভাঙলে?

‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এ জাতীয় একটা কথা ঈদ-পূজার আগে প্রায় শুনি। সত্যি কি তাই? চলুন দেখা যাক।
মন্দিরের সামনে গরু কোরবানী

ইদুল আযহা, মুসলমানদের একটি ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবটি মূলত পশু কোরাবনীর মাধ্যমে উদযাপন করা হয়। কোরবানীর পশু হিসেবে থাকে গরু, ছাগল ইত্যাদি। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা গরুকে তাদের দেবতা রূপে পূজা করে। আর মুসলমানরা কোরবানী ঈদে আনন্দের সাথে গরু কোরবানী করে। এতে সনাতান ধর্মের অনুসারীদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে। যদিও দেশে ধর্মানুভূতির আদর-যত্নের জন্য ৫৭ ধারা রয়েছে। কিন্তু সেটি এক্ষেত্রে একেবারেই প্রযোজ্য নয়।

হিন্দুরা মাটির মূর্তি বানিয়ে তাদের কল্পিত দেবদেবীদের পূজা করে। আবার মূর্তি পূজা ইসলামে নিষিদ্ধ। শুধুই নিষিদ্ধ নয়, এ বিষয়ে সহীহ্‌ বুখারী, হাদিয়াত ২২৩৬ এ উল্লেখ আছে, ‘হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের সময় মক্কায় থাকা অবস্থায় এই ঘোষণা দিয়েছেন যে, আল্লাহ ও তার রাসূল মদ ও মূর্তি এবং ও শুকর বিক্রি করা হারাম করেছেন’।

সহীহ্‌ মুসলিম, হাদিয়াত ৯৬৯ এ আছে, আবুল হাইয়াজ আসাদী বলেন, আলী ইবনে আবী তালেব (রা.) আমাকে বললেন, “আমি কি তোমাকে ওই কাজের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করব না, যে কাজের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে প্রেরণ করেছিলেন? তা এই যে, তুমি সকল মূর্তি বিলুপ্ত করবে এবং সকল সমাধি-সৌধ ভূমিসাৎ করে দিবে এবং সকল চিত্র মুছে ফেলবে”।

এছাড়াও মুসনাদে আহমাদ এ বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘আলী ইবনে আবী তালেব রা. বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি জানাযায় উপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি বললেন, “তোমাদের মধ্যে কে আছে, যে মদীনায় যাবে এবং যেখানেই কোনো প্রাণীর মূর্তি পাবে তা ভেঙে ফেলবে, যেখানেই কোনো সমাধি-সৌধ পাবে তা ভূমিসাৎ করে দিবে এবং যেখানেই কোনো চিত্র পাবে তা মুছে দিবে?” আলী রা. এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত হলেন। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে কেউ পুনরায় উপরোক্ত কোনো কিছু তৈরী করতে প্রবৃত্ত হবে সে মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি নাযিলকৃত দ্বীনকে অস্বীকারকারী।”
স্থানঃ সাতক্ষীরা, মুর্তি ভাঙ্গা উৎসব, ২০১৫।
  কাজেই, ইসলাম ধর্ম মতে, মূর্তি ভাঙা  প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।  প্রতিবছর বিশেষ করে শারদীয় দুর্গা  পূজায়, বাংলাদেশে অনেক আদর্শ  মুসলমান নিষ্ঠার সাথে এই দায়িত্ব  পালন করেন। সনাতন ধর্ম অনুসারে  মূর্তি ভাঙা পাপ হলেও ইসলাম ধর্ম মতে এটিকে সোয়াবের কাজ বলাই যায়।

 অথচ মূর্তি ভাঙার খবরগুলোতে যারা মূর্তি ভেঙেছে তাদেরকে দুর্বৃত্ত হিসেবে  চিহ্নিত করা হয়। এ নিয়ে যখন টকশো’তে আলোচনা হয় তখন মডারেট  মুসলমানেরা বলে থাকেন, এসকল দুর্বৃত্তদের কোন ধর্ম নেই, ইসলাম শান্তির  কথা বলে, ইসলামে মূর্তি ভাঙার কথা বলা হয় নি। অথচ ইসলাম ধর্মের সূচনা হয়েছিল কোরাইশদের ৩৬০ টি মূর্তি ভাঙার মধ্য দিয়ে। হযরত মোহাম্মদ নিজ হাতে এসব মূর্তি ভেঙেছেন। তার মানে কি তারা তাদের নবীকেও দুর্বৃত্ত মনে করেন? তারা নিজেরা মূর্তি না ভেঙে, মূর্তি পূজার পক্ষে কথা বলে ধর্মবিরোধী কাজ তো করছেনই, সাথে আবার ‘ইসলামে মূর্তি ভাঙার কথা নেই’ এই জাতীয় কথা বলে মানুষকে ইসলাম ধর্মের ইতিহাস সম্পর্কে মিথ্যা ও ভূল ধারণা দিচ্ছেন। 

তবে সরকার এই বিষয়ে খুব সচেতন। আইন অনুযায়ী, কেউ মূর্তি ভেঙে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিলে তাদেরকে ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করার কথা। কিন্তু মূর্তি ভাঙার জন্য গ্রেফতার করা মানে তো মোহাম্মদের যুগে ৫৭ ধারা থাকলে তিনিও একই অপরাধে গ্রেফতার হতেন। কাজেই নবীকে অনুসরণ করে যারা মূর্তি ভাঙছে, তাদেরকে কোনরকম গ্রেফতার না করে বরং অবিশ্বাসীদের কেউ যদি মডারেটদের দেওয়া ভুল তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে, তবে তাদের জন্য ৫৭ ধারা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে এভাবেই ৫৭ ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। 

একদিকে মডারেট মুসলমানরা ইসলাম সম্পর্কে ভুল-মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন, অন্যদিকে বাংলার হুজুর সমাজ নিরলস ভাবে মূর্তি পূজা সম্পর্কে ইসলামের বাণীগুলো মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। পিস টিভি বাংলার একজন জনপ্রিয় হুজুর হলেন, আব্দুর রাজ্জাক। হুজুর আব্দুর রাজ্জাক তার বিভিন্ন ওয়াজ গুলোতে মূর্তি পূজা সম্পর্কে ইসলামে কি বলা আছে এবং মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন। তিনি তার এক ওয়াজে বলেছেন, “আমি মুসলিম চির  রণবীর, মরণকে করিনা ভয়। আমি ছবিকে কবর দিতে এসেছি। আমি মূর্তিকে লাত্থি দিয়ে ভাঙতে এসেছি! তুমি জানো না আমি মুসলিম? তুমি যখন বিজাতিতে চলে গেছ, সেটা তোমার ব্যাপার। তুমি তো পহেলা বৈশাখ মানো, আমি কি হিন্দুর বাচ্চা? আমি কি হিন্দুর ঘরে জন্ম নিয়েছি নাকি আমি পহেলা বৈশাখ মানবো? তুমি বলো কী! তুমি জানো না আমি মুসলিম? আমার রক্তের সাথে মিশে আছে মূর্তি-ভাঙা নীতি, আমার গোস্তের সাথে মিশে আছে মূর্তি-ভাঙা নীতি, আমি পহেলা বৈশাখকে কবর দিতে এসেছি…আমি হিন্দুর ঘরে জন্ম নেই নি, আমি মুসলিম চির রণবীর, মরণকে করিনা ভয়। মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী—আমার উভয়ই সমান”। 


হিন্দুদের মূর্তি ভাঙার পর, মুসলমানরা সাধারণত দাবী করেন, যেহেতু দেবদেবীরা নিজেদের মূর্তি নিজেরা রক্ষা করতে পারে নি, কাজেই সনাতন ধর্ম একটি মিথ্যা ধর্ম আর এতেই প্রমাণিত হয়, ইসলাম একমাত্র সত্য ধর্ম।

মক্কায় ক্রেন দুর্ঘটনায় শ'খানেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, মিনায় পদদলিত হয়ে মারা গেছেন প্রায় হাজার খানেক মানুষ। যদিও সৌদি আরব তাদের ব্যবসায়িক কারণে মিনায় প্রকৃত মৃতের সংখ্যাটি গোপন রেখেছে। মুসলমানরা আল্লাহ্‌র ঘরকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান বলে মনে করেন। আর হাজীরা হলেন ‘আল্লাহ্‌র মেহমান’। অথচ আল্লাহ তার অতিথিদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে যথারীতি ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করা হয়।


তবে আর যাই হোক, আল্লাহর ঘর কাবা কখনও বন্যা-ভুমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্থ হয় না – এই জাতীয় কথা মুসলমানদের কাছ থেকে শুনে আসলেও গুগল করে ১৯৪১ সালের বন্যায় কাবাঘর ডুবে যাওয়ার বেশ কিছু ছবি ভিডিও পেয়ে গেলাম।



মূর্তি-মন্দির ভাঙার মাধ্যমে হিন্দুদের দেবদেবীদের অক্ষমতা প্রমাণিত হয়, একই ভাবে আল্লাহ্‌র ঘর- মসজিদ ভাঙার মধ্য দিয়েও কি আল্লাহর অক্ষমতা প্রমাণিত হয়?

ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙা নিয়ে ভারতসহ বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময়ে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর মুসলমানদের অত্যাচারের চিত্র গুলো ফুটে উঠেছিল তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’ বইটিতে। দেশের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এই অযুহাত দেখিয়ে ‘লজ্জা’ বইটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। 

মসজিদ ভাঙার তথ্য বের করতে গিয়ে বেশ কিছু মসজিদ ও মাজার পেলাম যেগুলা ভাঙা হয়েছে মুসলমান জঙ্গিদের দ্বারা।

বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০১৫

সার্কাসের দেশ!

৫৭ ধারার খেলা বেশ জমেছে দেখছি। কিছুদিন আগে একইসঙ্গে মূর্তিপূজা ও কোরআন পড়ার অপরাধে সোলেমান ও তার স্ত্রী নূরজাহান বেগম’কে আটক করেছে পুলিশ। নূরজাহান বলেন, “ধনসম্পদ প্রাপ্তিসহ সন্তানের মঙ্গলের আশায় দীর্ঘদিন থেকেই আমরা সাধনা করছি। কিছুদিন আগে স্বপ্নে বাড়িতে
কালীপূজা ও কোরআন তেলাওয়াতসহ জিকির-আসকার করার নির্দেশনা পাই।” সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মশিউর রহমান বলেন, “একটি মানুষ কখনোই দুটি ধর্মের অনুসারী হতে পারে না। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছে।” খুব জানতে ইচ্ছে করছে, কোন ব্যক্তি একই সঙ্গে দুটি ধর্মের অনুসারী হলে ঠিক কোন ধর্মের মানুষের অনুভুতিতে আঘাত লাগে? সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কথা বলা হয়। সব ধর্মকে শ্রদ্ধা করা যাবে কিন্তু একাধিক ধর্ম পালন করা বা বিশ্বাস করা যাবে না! তাতে নাকি অনুভূতিতে আঘাত লাগে! 


সৌদি আরবের হজ্ব ব্যবসা যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ব্যবসা এই কথা স্পষ্ট করে বলেছিলেন লতিফ সিদ্দিকী। এরপর তার বিরুদ্ধে মিছিল, গ্রফতার হওয়া, মন্ত্রীত্ব বাতিল সহ নানাভাবে তাকে হেনস্থা করা হল। 


এবারের হজ্বে সৌদি আরবের যুবরাজের যাতায়াতের সুবিধা করতে গিয়ে প্রায় হাজার খানেক লোকের প্রাণ গেলো। যদিও সৌদি আরবের স্বাস্থ্য মন্ত্রী নাকি বলেছেন, তেরোশ মানুষ আল্লার ইচ্ছাতেই পদদলিত হয়ে মারা গেছে। এই নিয়ে স্ট্যাটাস দেয়া্র কারণে মোহন কুমার মন্ডল নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সাবেক জামাতী নেতা যিনি বর্তমা্নে আওয়ামীলীগের নেতা হয়েছেন, সেই নেতার নাকি ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লেগেছে। তিনি আঘাতের চিকিৎসা নিতে পুলিশের কাছে গিয়ে ৫৭ ধারার মামলা করে এসেছেন। পুলিশের জানা নেই মোহন কি লিখেছেন। তবে আওয়ামীলীগ নেতার দ্রুত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে মোহন কুমারকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এদিকে শুনছি, সৌদি আরবের মক্কা প্রশাসন ছয়টি কবরস্থানে ৭৪ হাজার ৭০০
কবর প্রস্তুত করছে। এসব কবরে মিনায় পদপিষ্ট হয়ে মারা যাওয়া কিছুসংখ্যক হাজিসহ অন্যদের দাফন করা হতে পারে। যদিও সৌদি প্রশাসনের মতে মিনায় পদপিষ্ট হয়ে মারা যাওয়া লোকের সংখ্যা সাতশ। তবে এত কবর কেন? এখানে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, হজ্ব ব্যবসায় ধ্বস নামার ভয়ে মৃতের সংখ্যা গোপন করা হচ্ছে। এরপরও হজ্বকে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ব্যবসা বলা যাবে না, বললেই ৫৭ ধারা। এই হজ্বে আবার যৌন হয়রানিরও অভিযোগ পাওয়া যায়। বড়ই সৌন্দর্য! 
বাংলাদেশের আইনগুলোর মধ্যে সম্ভবত ৫৭ ধারাটাই সবচেয়ে কার্যকর। ৫৭ ধারাটা না থাকলে বুঝতামই না যে বাংলাদেশে আইনকানুন বলে কিছু আছে!

আইএস বলেছিল পাঁচ বছরের মধ্যে ভারতসহ সারা বিশ্ব দখল করার টার্গেট নিয়েছে। আগেই বলেছিলাম, বিশ্ব দখল করতে পারবে কিনা সেসব জানি না, তবে বাংলাদেশ দখল করতে বেশি দেরী নেই। দেরী নেই জানতাম, তবে এত তাড়াতাড়ি ঘোষণা দিয়ে হত্যা কার্যক্রম শুরু করবে, জানা ছিল না। দেশের বাইরে থাকার কারণে দেশের খবর পেতে হলে ইন্টারনেটই ভরসা। খবর পেলাম, ঢাকায় ইতালীয় নাগরিক খুনে জঙ্গী সংগঠন আইএসের 'দায় স্বীকার'।
অনেকের ধারনা বাংলাদেশে আইএস, আলকায়দা এইসব জঙ্গি সংগঠন বলতে বিদেশী কিছু জঙ্গি টঙ্গি। দেশে এত জঙ্গি কারখানা মাদ্রাসা থাকতে বিদেশ থেকে জঙ্গি আনার কি দরকার পড়েছে? বাংলাদেশে সব জঙ্গিদের পিতা জামায়েত শিবির, এটা নিশ্চয়ই কারো অজানা নয়! আর জঙ্গি-জঙ্গি ভাই-ভাই, কাজেই আইএস এর লক্ষ্য পূরণে জামায়েত শিবির এগিয়ে আসবে, স্বাভাবিক।

যাইহোক, দেশ জঙ্গিতে ভরে যাক, তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। কিন্তু দেশ নাস্তিক মুক্ত রাখা জরুরী। এর জন্য তো ৫৭ ধারা আর সাথে চাপাতি আছেই। তবে আর চিন্তা কিসের?

দেশে বিনোদনমূলক সার্কাস চলছে, আপনারা উপভোগ করছেন তো?