সোমবার, ১৩ জুন, ২০১৬

ট্যাবুঃ সমকামিতা, পিরিয়ড!

১. আমেরিকার ফ্লোরিডায় সমকামীদের ক্লাবে মুসলমান জঙ্গির বন্দুক হামলায় নিহত ৫০, আহত ৫৩। ফ্রান্সে বোমা হামলা, বেলজিয়ামে হামলা, বাংলাদেশে প্রতিদিন সংখ্যালঘু-নাস্তিক-প্রগতিশীলদের হত্যা। প্রতিদিন এত এত মানুষের মৃত্যুর খবর, অসহনীয় হয়ে উঠছে দিন দিন। ধর্ম নামক একটি রূপকথা প্রতিষ্ঠা করতে এই হত্যাযজ্ঞ! ভাবা যায় না, একবিংশ শতাব্দীতেও মানুষ এসব রূপকথায় বিশ্বাস করে সহিংসতা করে বেড়াচ্ছে। অনেকে হয়তো বলবেন, এর পেছনে ধর্ম নয়, আছে রাজনীতি। আমেরিকা আলকায়দা-আইএস সৃষ্টি করেছে নিজেদের স্বার্থে, ধর্মের কোন দোষ নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কি ভারতের সৃষ্টি ছিল? বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ শুরু করার পরই ভারত বাংলাদেশকে সহায়তা করেছে। ঠিক একই ভাবে সব দোষ রাজনীতির উপর দিয়ে ধর্মকে মহান কিছু বানানোর উপায় নেই। সমকামীদের ক্লাবে হামলার প্রসঙ্গে যারা বলছে, ইসলামে হত্যার কথা বলা নেই। তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন সমকামীতার শাস্তি ইসলামে কী আছে। তাহলেই বুঝে যাবেন। প্রকৃতিতে ৪৫০ থেকে মতান্তরে ৪৮০ প্রজাতির মধ্যে সমকামীতা পরিলক্ষিত হয়। ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী আলফ্রেড কিন্সের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতি দশ জন ব্যক্তির একজন সমকামী। সমকামীতা প্রকৃতি বিরুদ্ধ কিছু নয়। এটিকে জটিলভাবে দেখে ধর্মের নিয়ম মেনে তাদেরকে আপনি হত্যা করছেন। পশুপাখিদের সমাজে ধর্ম নামক রূপকথাটির অস্তিত্ব নেই বলে, ধর্মের বর্বর নিয়ম মেনে তাদের কাউকে হত্যা করার প্রয়োজন হয় না। এদিক থেকে পশুপাখিরা আমাদের চেয়ে অনেকটাই সভ্য বলা যায়।

২. নাস্তিকদের ভিন্নমতের কারণে তাদেরকে খুন করাকে প্রশ্রয় দিয়েছি। এখন তাদের হত্যার লিস্ট আর নাস্তিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভিন্ন মতের জন্য যদি হত্যা করাকে আপনি প্রশ্রয় দেন, তাহলে একদিন হত্যাকারীরা আপনাকেও হত্যা করতে আসবে, কারণ হত্যাকারীদের সব মতের সাথে আপনিও একমত নন, একমত হওয়া সম্ভব না। একসময় দেখা যাবে হত্যাকারীরা নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা করছে, কারণ তাদের মধ্যেও মতের পার্থক্য দেখা যাবে। আমাদের সকলেরই বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের আলাদা মত রয়েছে। নাস্তিকদের মধ্যেও নানা বিষয়ে একেক জনের একেক মত, এ নিয়ে প্রতিনিয়ত অনলাইনে যুক্তি তর্ক হচ্ছে। আমি নিজের কথা বলতে পারি, আমি অনলাইনে এসে অনেক কিছু জেনেছি-শিখেছি এই যৌক্তিক তর্কে অংশ নিয়ে। দেশের চলমান অবস্থায়, প্রত্যেকেই আতংকিত। নাস্তিক হত্যার সময় আপনার নীরব সমর্থনই আপনাকে আজকের এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। আমরা আসলে একটা স্বার্থপর জাতি। যতদিন নিজের ঘাড়ে কোপ না আসে, ততদিন বুঝি না কোপের যন্ত্রণা।

৩. ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুললেই মন্তব্য আসে, ‘সকল মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত’। আমি স্বাধীনভাবে আমার মত প্রকাশ করব, আপনিও আপনার মত প্রকাশ করবেন। আপনার মত আমার কাছে যত জঘন্যই মনে হোক না কেন, আপনার মত প্রকাশে আমি বাধা হয়ে দাঁড়াব না, এটিই হলো বাকস্বাধীনতা, এখানেই আপনার মতের প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিহিত। অথচ আমরা মনে করি, আপনার মতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে, আমার মত প্রকাশ করলে আপনার অনুভূতিতে আঘাত লাগবে এজন্য এখন আমাকে চুপ থেকে আপনার মতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হবে!
ধার্মিকেরা অন্য ধর্মের নিন্দা শুনতে পছন্দ করে, নিজের ধর্ম নিয়ে কিছু বললেই অনুভূতিতে আঘাত লাগে। হিন্দুরা অনেকে বলে থাকেন, হিন্দু ধর্মে পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। কারও কিছু মানতেই হবে এরকম কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এই ধর্মে এমন কোন কথা বলা নেই যা সরাসরি ঈশ্বর বলেছেন, এই ধর্মের সব গ্রন্থই মুনিঋষিরা নিজেদের অর্জিত জ্ঞান থেকে লিখেছেন, যা সবাইকে মানতে হবে এমন কোন কথা নেই। এখন প্রশ্ন হল, যেহেতু তাদের নির্দিষ্ট কোনও নিয়ম বা বাধ্যবাধকতা নেই, কাজেই তারা তো নিজেদের মত নিজেরা স্বাধীন থাকতে পারে, 'সনাতন ধর্ম’কে ব্যানার করে আলাদা একটা গোষ্ঠী বানানোর কী প্রয়োজন?
আমরা অনেক সময় বলি, ‘লোকটা খুব ভালো’ প্রমাণ হিসেবে বলি, ‘৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন’ নামাজ রোজা করার সাথে কারোর ভালো হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। ধর্মের সাথে নৈতিকতার কোন সম্পর্ক নেই। নামাজ রোজা কাদের মোল্লা, কামারুজ্জমান সহ সকল যুদ্ধাপরাধীরাও করতো। নামাজ-রোজা জঙ্গিরাও করে। বরং সাধারণের চেয়ে একটু বেশিই করে। আমি বরং ধার্মিক ব্যক্তির কথা শুনলে সাবধান হই। কারণ তার নিশ্চিয়ই ধর্মানুভূতি নামক একটা তীব্র অনুভূতি আছে, যেটা কথায়-কথায় আহত হয়, আর এই অনুভূতি আহত হলে সে আমাকে খুন পর্যন্ত করতে পারে।
গতকাল পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে, ইফতারের আগে খাদ্যগ্রহণ করায় এক অশীতিপর বৃদ্ধ হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে পাকিস্তানের এক পুলিশ কনস্টেবল ও তার ভাই বেধড়ক পিটিয়েছে। এই ঘটনায় কনস্টেবল পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তার ভাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনা যদি বাংলাদেশে ঘটতো, তবে কাউকে গ্রেফতারের প্রশ্নই আসে না। উল্টো নির্ধারিত সময়ের আগে রোজাদারদের সামনে বিরিয়ানী খেয়ে ধর্মানুভুতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হতো।

৪. রোজার মাসে আরেকটা কমন প্রশ্ন, আপনি কি রোজা? মেয়েদেরকে সাধারণত এই ধরণের প্রশ্ন করা হয়। ‘না’ উত্তর শুনে ‘না’ এর কারণটা কল্পনা করে অনেকে সুখ পায়। কী নোংরা আমাদের মানসিকতা! পিরিয়ডের মত স্বাভাবিক একটি বিষয়কে ট্যাবু বানিয়ে রেখেছি।
আমাদের কলেজে স্টুডেন্টদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা ছিল। এক বান্ধবীর পিরিয়ড হলে আমরা মেডিকেলে গেলাম প্যাড আনতে। মেডিকেল রুমে ডাক্তারের সামনে বসে ছিল আমাদেরই একজন ছেলে সহপাঠী।তার মাথা ব্যথা জাতীয় কোন সমস্যা। নার্সকে জানালাম প্যাড লাগবে। উনি আমাদেরকে চুপ থাকতে বললেন। ওই ছেলে চলে যাওয়ার পরই নার্স প্যাড দিলেন। ওই ছেলের সামনে প্যাড হাতে নিতে তিনি লজ্জা পাচ্ছিলেন।
প্রতি মাসে মেয়েদের শরীরে একাধিক ডিম্বাণু বড় হতে থাকে এবং মাসের মাঝামাঝি সময়ে একটি পরিণত অবস্থায় স্ফুরিত হয়। ডিম্বাশয় থেকে বের হয়ে আসা ডিম্বাণু শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হলে ভ্রূণ তৈরি হয়, আর তা না হলে ডিম্বাণু ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে মিলিয়ে যায়। আবার নতুন ডিম্বাণু বড় হতে থাকে। ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণুটি বের হওয়ার সময় কিছুটা তরল পদার্থ বের হয়ে আসে, সেটিই পিরিয়ড। আর এই স্বাভাবিক ব্যাপারটা নিয়ে যারা মুচকি হাসতে পছন্দ করে, আপনি বরং তাদের অজ্ঞতা নিয়ে হাসতে পারেন। রোজা রেখেছেন কিনা জিজ্ঞেস করলে অনেকে বিব্রত হয়ে যান। সবচেয়ে ভালো হয় ধর্মমুক্ত হয়ে এসব ট্যাবুর বিরুদ্ধে যাওয়া, কারণ এসব ট্যাবু ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রের সৃষ্টি। যদি তা না পারেন অন্তত স্পষ্ট কন্ঠে জানান, আপনার পিরিয়ড চলছে। পিরিয়ড চলাকালে অনেকে পরিবারের সাথে সেহেরী খেতে উঠে। সারাদিন কিছু খায় না। কারণ পরিবারের বাবা-ভাইয়েরা যদি বুঝতে পারে যে, সে আসলে রোজা রাখে নি, তার পিরিয়ড চলছে। তবে এটা খুব লজ্জার ব্যাপার হবে। লজ্জা ভাঙ্গুন। পিরিয়ড নিয়ে লুকোচুরি খেলা বন্ধ করুন।

বৃহস্পতিবার, ২ জুন, ২০১৬

পুরুষানুভূতি ও তসলিমার নির্বাসনের ইতিকথা

'তসলিমা নাসরিন’ নামটির পাশে বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিকেরা ‘বিতর্কিত লেখিকা’ শব্দটি লিখে খুব আনন্দ পায়। তসলিমা নাসরিনের একটি বইও যে পড়ে নি, তাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, তসলিমা নাসরিন’কে সে চিনে কিনা, সে হয়তো বলবে, ‘ওই যে ইসলাম বিদ্বেষী বিতর্কিত লেখিকার কথা বলছেন?’ তসলিমা নাসরিনের লেখা পড়ে আমার কখনো মনে হয় নি তিনি বিতর্কিত কিছু লিখেছেন। আমার কাছে তাঁর আদর্শ, চিন্তা -চেতনা একেবারেই স্পষ্ট ও সঠিক মনে হয়েছে। অবশ্য যারা নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাসী নন, যারা নারীকে কেবল মা-বোন-বধূ রূপেই দেখতে পছন্দ করেন তাদের কাছে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়গুলো বেশ বিতর্কিতই মনে হবে। তবে আশার কথা, ইদানীং বেশকিছু পত্রিকা বিতর্কিত শব্দটির জায়গায় ‘জনপ্রিয় লেখিকা’ শব্দটি ব্যবহার করছে।

‘তসলিমা নাসরিন’ নামটির সাথে আমার পরিচয়, যখন আমি ক্লাস৫ এ পড়ি। ‘লজ্জা’ পড়েছিলাম তখন। তখন ‘হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা’ ব্যাপারটা আসলে কী, এ সম্পর্কে স্পষ্ট কোন ধারণা না থাকলেও জীবনের আটটি বছর গ্রামে কাটানোর কারণে গ্রামে হিন্দু পাড়ার প্রতি মুসলমানদের দৃষ্টি ভঙ্গি কেমন হয়, সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা ছিল।

১৯৯৩ সালে সরকারী এক তথ্যবিবরনীর মাধ্যমে তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’ বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। সেই তথ্য বিবরণী অনুযায়ী, জনমনে বিভ্রান্তি ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অঙ্গনে বিঘ্ন ঘটানো এবং রাষ্ট্র বিরোধী উসকানিমূলক বক্তব্যপ্রকাশিত হওয়ার জন্য ‘লজ্জা’ নামক বইটির সকল সংস্করণ সরকার বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। প্রকৃতপক্ষে মৌলবাদীদের আন্দোলনের কাছে মাথা নত করা সরকার, মৌলবাদীদের খুশি করতে বইটিকে বাজেয়াপ্ত করে।

‘লজ্জা’ বইটি ছিল মূলত তথ্য ভিত্তিক বই। ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর মুসলমানদের বর্বরতার ঘটনাগুলোই লেখক তাঁর লেখায় চিত্রিত করেছিলেন। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হলেও পরবর্তীতে ৩০টিরও বেশি ভাষায় বইটি অনূদিত হয়।

আরও একটু বড় হয়ে পড়েছিলাম ‘নিমন্ত্রণ’ নামের বইটি। ‘নিমন্ত্রণ’ বইটির প্রথম অংশে দুজন মানুষের প্রেমের কথা থাকলেও, এই গল্পের শেষটি ছিল খুবই বাস্তব এবং নির্মম। শেষ অংশটিতে ছিল, প্রেমিকা কীভাবে প্রেমিকের সাথে দেখা করতে গিয়ে প্রেমিক ও প্রেমিকের বন্ধুদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছিল সেই কথা। এই সেদিনও খবরে দেখলাম, ঢাকায় প্রেমিকের সাথে দেখা করতে গিয়ে প্রেমিক ও তার বন্ধুদের দ্বারা প্রেমিকা ধর্ষিত হয়েছে। এসব ঘটনা অহরহ ঘটছে।

গল্পে প্রেমিক প্রেমিকার প্রেম থাকবে, প্রেমিকাকে হিরো প্রেমিক সব বিপদ থেকে রক্ষা করছে, এধরণের কাহিনীর লেখকরাই সমাজে হাত তালি পাবেন। কিন্তু সমাজের বাস্তব চিত্র যেই লেখকের লেখায় উঠে আসবে, তিনি হবেন নিষিদ্ধ। কারণ আমাদের নিজেদের বাস্তব রূপটা যে এতটাই কুৎসিত, সেটা আমরা নিজেরাই মেনে নিতে পারি না।
এরপর পড়ি, ‘অপরপক্ষ’। নারীকে মায়ের জাত বলে, মাতৃত্বের জন্য নারীকে মহান করে দেখানো হয়। অথচ, পিতার পরিচয় ছাড়া সন্তানের কোন পরিচয় নেই, সে নাকি হয় ‘জারজ সন্তান’। সমাজের এই ভণ্ডামীটা ‘অপরপক্ষ’ নামক উপন্যাসে অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতা আমার ভালো লাগে না, বেশির ভাগ কবিতার বইগুলোতে কেবল প্রেম আর প্রেম। বাস্তবে তো নারীর প্রতি পুরুষের প্রেম কোথাও দেখি না। দেখি নারীর শরীরটির প্রতি পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি। ‘নির্বাচিত নারী’ নামক কবিতার বইটিতে বাস্তবভিত্তিক অসাধারণ কিছু কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

‘নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য’ বইটির ভূমিকায় লেখক লিখেছেন, ‘নিজেকে এই সমাজের চোখে নষ্ট বলতে আমি ভালোবাসি। কারণ এ-কথা সত্য যে, যদি কোনও নারী নিজের দুঃখ-দুর্দশা মোচন করতে চায়, যদি কোনও নারী কোনও ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের নোংরা নিয়মের বিপক্ষে রুখে দাঁড়ায়, তাঁকে অবদমনের সকল পদ্ধতির প্রতিবাদ করে, যদি কোনও নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সজাগ হয়, তবে তাকে নষ্ট বলে সমাজের ভদ্রলোকেরা। নারীর শুদ্ধ হবার প্রথম শর্ত নষ্ট হওয়া। নষ্ট না হলে এই সমাজের নাগপাশ থেকে কোনও নারীর মুক্তি নেই। সেই নারী সত্যিকার সুস্থ ও শুদ্ধ মানুষ, লোকে যাকে নষ্ট বলে’। ঠিকই তো, প্রতিবাদী কোন নারীকে দমিয়ে দিতে প্রথম যেই শব্দগুলো তার দিকে ছুড়ে দেয়া সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ‘নষ্ট মেয়ে’।

‘যাবো না কেন? যাবো’ বইটির নামের মধ্যেই রয়েছে একপ্রচন্ড সাহসীকতা। ‘নির্বাচিত কলাম’ বইটি মূলত লেখকের নব্বইয়ের দশকের পুরুষতন্ত্র ও ধর্মের ভন্ডামী নিয়ে লেখা অসাধারণ কলামগুলো নিয়ে সাজানো হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে, লেখক হিসেবে তসলিমা নাসরিন ছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। ৭১এর পর বাংলাদেশে নাস্তিকতা ও নারীবাদের হাতে খড়ি হয়েছে তসলিমা নাসরিনের মাধ্যমে। সেসময় তিনি একাই তার ‘অস্ত্র’ (কলম) তুলে ধরেছিলেন, ধর্মের বিরুদ্ধে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে। অন্য কোন লেখককে তখন এধরণের বিপদজনক লেখা লিখতে দেখা যায় নি। পরে অবশ্য তসলিমা নাসরিনের জনপ্রিয়তাকে হিংসে করে অনেকেই নারীবাদী বই লেখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু নিজে নারী হয়ে, নিজের সাথে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতা, নারীর দুঃখ কষ্টগুলো অনুভব করে লেখা, আর জনপ্রিয়তা লাভের জন্য, নিজের চরিত্রে চরম পুরুষতান্ত্রিকতা রেখে নারীবাদ লেখা তো আর এক হয় না।

‘ছোট ছোট দুঃখ কথা’, ‘দুঃখবতী মেয়ে’, ‘নারীর কোনও দেশ নেই’, ‘নিষিদ্ধ’, ‘শোধ’, ‘বন্দিনী’ বইগুলো পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাঁর বইগুলো আমাকে শিখিয়েছে অনেক কিছু। সমাজের নিয়মনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের অধিকারের পক্ষে লড়াই করার সাহসটুকু আমি সেখান থেকেই পেয়েছি।

তসলিমা নাসরিনের আত্মজীবনীর ৭টি খন্ড পড়লেই বোঝা যায়, লেখক হিসেবে তিনি কতটা সৎ। যদিও ৭টি খণ্ডের মধ্যে ৪টিই বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। আত্মজীবনীতে নিজের ভুল ত্রুটি গুলো লিখতে কুন্ঠাবোধ করেন নি। পরবর্তীতে সেসব ভুলগুলো সাহসের সাথে মোকাবেলা করার কথাও তিনি লিখেছেন। ‘উতল হাওয়া’ বইটিতে রুদ্রের সাথে প্রেমের ঘটনা পড়ে আমরা সবাই বলেছি, ‘আহা কী প্রেম!’ রুদ্রের নষ্টামিগুলো পড়ে অনেকে বলেছে, ‘নিজের বাসর ঘরের কাহিনী কেউ এভাবে রাখঢাক না রেখে বর্ণনা করে! ছি কী অশ্লীল!’ অথচ কারও চোখে পরে নি, বাসর ঘরে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে আসা মেয়েটির স্বপ্ন ভঙ্গের কষ্ট। ‘ক’ বইটি আমার কাছে মনে হয়েছে তসলিমা নাসরিনের আত্মজীবনীগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ট একটি বই। এই বইয়ে অন্য বইগুলোর মত নারীর জীবনের কান্না-দুঃখ-কষ্টগুলোর চেয়েও বেশি ফুটে উঠেছে বাধা উপড়ে সামনে এগিয়ে চলার সাহসীকতা। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, ‘মেয়েবেলা’, ‘উতল হাওয়া’ বইগুলো পড়ে যারা হাততালি দিয়েছেন, তাদের অনেকেই আবার এই বইটির বিরুদ্ধে গেছেন। নারী কেবল পুরুষতান্ত্রিক শেকলে বন্দী হয়ে যন্ত্রণায় কাঁদবে, প্রেমিককে সমস্ত প্রেম উজাড় করে দিয়ে প্রতারিত হয়ে হতাশায় ডুবে থাকবে এসব দেখতে আমাদের সমাজ অভ্যস্ত হলেও নারী মেরুদণ্ড সোজা করে উঠে দাঁড়িয়েছে, সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, এটাতে অভ্যস্ত নয় আমাদের সমাজ। তাই সমাজের প্রগতিশীল পুরুষেরা এই বইয়ের বিরুদ্ধে গেছে। সবচেয়ে অবাক হয়েছি বাংলাদেশে প্রথাবিরোধী লেখক হিসেবে পরিচিত হুমায়ুন আজাদের বক্তব্যটি পড়ে। তিনি বলেছেন, ‘সম্প্রতি প্রকাশিত 'ক' বইটি সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পড়ে আমার মনে হয়েছে, এটি একটি পতিতার নগ্ন আত্মকহন অথবা একজন নিকৃষ্টতম জীবনের কূরুচিপূর্ন বর্ণনা’। তাঁর এই বক্তব্যতেই বুঝতে পেরেছি, তিনি নারীবিরোধী প্রথাগুলো খুব যত্নে নিজের মধ্যে লালন করতেন।

‘ক’ বইটি নিয়ে বাংলাদেশের আরও কয়েজন বুদ্ধিজীবীর বক্তব্য পড়ে তাদের নোংরা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় পেয়েছি।

ইমদাদুল হক মিলন, সাহিত্যিক
ও নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই। তার বই আমি পড়িনি। দু একজনের কাছে শুনেছি কী লিখেছে। কিন্তু যাই লিখুক, আমি তাতে ইন্টারেস্ট ফিল করছি না। বাদ দিন ওসব।
মানবজমিন, ১ নভেম্বর, ২০০৩

সৈয়দ শামসুল হক, সাহিত্যিক
তসলিমা আমার চরিত্র হনন করেছে। মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। ৫২ বছরে লেখক হিসেবে আমি যে সম্মান কুড়িয়েছিলাম তা আজ ধুলিস্যাৎ। নিশ্চয়ই এর পিছনে কিছু রহস্য আছে। না হলে তিনি দেশের এত সম্মানিত লেখক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে লিখতে সাহস পেতেন না। আমার মনে হয়েছে, প্রতিবাদ করা দরকার। তাই মামলা ঠুকে প্রতিবাদ জানালাম।
সংবাদ প্রতিদিন, ১০ নভেম্বর, ২০০৩

আসাদ চৌধুরী, সাহিত্যিক
‘ক’ বইটি আমি পড়িনি। তবে যার বিরুদ্ধে লেখা হোক না কেন, লেখকের ওপর পাঠকের কতটুকু আস্থা আছে তা অবশ্য মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ ব্যক্তি সমাজ বিশাল জনগোষ্ঠি নিয়েই সাহিত্য, কোনও লাম্পট্যের নির্লজ্জ বর্ণনা কখনও সাহিত্য হতে পারে না।
আজকের কাগজ, ১১ নভেম্বর, ২০০৩

তসলিমা নাসরিনের কোনও বই ঢাকার কয়েকটি মার্কেট ছাড়া বাংলাদেশের আর কোথাও পাওয়া যায় না। আমি তসলিমা নাসরিনের যেসকল বই পড়েছি, তার বেশিরভাগই বুক শেল্ফের পুরাতন বইয়ের তাকে ছিল। বাকিগুলো ঢাকা থেকে অর্ডার দিয়ে আনিয়েছি। দেশের কোনও দোকানে গিয়ে তসলিমা নাসরিনের বই চাইলে, আপনাকে প্রথমেই দোকানী জানিয়ে দেবে, ওই লেখকের বই তারা বিক্রি করে না। ফ্রিতে একটি উপদেশও দিয়ে দিতে পারে, ওই নাম যেন আপনি মুখে এনে আপনার মুখকে অপবিত্র না করেন। বাংলাদেশে ‘তসলিমা নাসরিন’ নামটি একটি নিষিদ্ধ নাম। নব্বইয়ের দশকে যিনি ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তিনিই কিনা এখন দেশে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ! আপনার কী ধারণা এর পিছনে দায়ী মৌলবাদীরা? মোটেই না। এজন্য দায়ী, ভোটের রাজনীতি আর সুবিধালোভী হীনচরিত্রের মানুষগুলো। মৌলবাদীদের কোনও ক্ষমতা ছিল না তসলিমা নাসরিনকে দেশ থেকে বের করার। তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছিল মৌলবাদ তোষণকারী সরকার।

তসলিমা নাসরিনের আত্মজীবনী চতুর্থ খণ্ডটি মূলত ১৯৯৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পর ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো নিয়ে।

তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার(বিএনপি) ধর্মানূভুতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগ তুলে তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা করে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি কোরান সংশোধনের কথা বলেছেন। অথচ তিনি শরিয়া নামক বর্বর আইনটি বাতিলের কথা বলেছিলেন, কোরান সংশোধনের কথা নয়। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি হলে তিনি আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। এ নিয়ে দৈনিক ভোরের কাগজে ক'জন বিশিষ্ট নাগরিকের মন্তব্য-

হুমায়ুন আজাদ, কবি, অধ্যাপক
নাসরিন নামের একটি তুচ্ছ বস্তুকে বাংলাদেশের অপদার্থ সরকার, আনন্দবাজার আর হিন্দু মুসলমান মৌলবাদীরা আন্তর্জাতিক বস্তুতে পরিণত করেছে। এটা এখনকার সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার।...এই সময়ের একটি বেশ হাস্যকর ব্যাপার হচ্ছে, নাসরিনের মত একটি তুচ্ছ বস্তুকে নিয়ে সারা পৃথিবীর মেতে ওঠা। পশ্চিম ইওরোপ তার জন্য দরজা খুলে দিয়েছে।

আমহদ ছফা, লেখক
তসলিমা নাসরিন ভারতের সৃষ্টি।...তসলিমা এবং তাকে যারা সমর্থন করে তারা মৌলবাদকে এমনভাবে উস্কে দিয়েছে, স্বাধীন চিন্তাভাবনার লোক মস্ত বিপদে পড়ে গেছেন।...তসলিমা এবং তার সমর্থকদের অবিবেচনার কারণে দেশের সমস্ত চিন্তাশীল ব্যক্তি একটি সঙ্কটের সম্মুখে পড়েছে।...একটি অমঙ্গলের শক্তি।

ফরিদা রহমান, সাংসদ, বিএনপি
ঐসব আজেবাজে লেখা ছেড়ে দিয়ে তসলিমার মাফ চাওয়া উচিত। তারপর সাধারণ জীবনযাপন করা উচিত।... জনগণ যদি ক্ষমা করে তারপর আমরা সাধারণ মহিলারা যেভাবে জীবনযাপন করি সেভাবে তার জীবনযাপন করতে হবে।

সুত্রঃ সেই সব অন্ধকার, তসলিমা নাসরিন।

সেই সময় মৌলবাদীদের তোষণ না করে যদি প্রকাশ্যে তসলিমা নাসরিনের মাথার মূল্য নির্ধারণকারী ধর্মীয় গুরুকে শাস্তির আওতায় আনা হতো, সুবিধাবাদী লেখক প্রগতিশীলেরা যদি সেসময় হিংসের বশবর্তী না হয়ে, সবাই এক হয়ে সেসব মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন, সরকারের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেন তবে হয়তো আজকের এই দিন আমাদের দেখতে হতো না। এই প্রগতিশীল লোকেদের অনেকেই পরবর্তীতে মৌলবাদীদের প্রশয় দেয়ার ফল ভোগ করেছেন এবং করছেন। সেই ১৯৯৪ সাল থেকেই তো মৌলবাদীরা প্রশ্রয় পেতে পেতে আজকের এই রূপ নিয়েছে। এজন্য মৌলবাদীরা নয়, বরং দায়ী সুবিধাবাদীরা- এ নিয়ে কারও সন্দেহ আছে কী?

বর্তমানে ব্লগার-লেখক-প্রকাশক ইত্যাদি প্রগতিশীল মানুষদের হত্যার বিরুদ্ধে দেশের বুদ্ধিজীবিদের তেমন কোন প্রতিবাদ লক্ষ্য করা না গেলেও, লক্ষ মাইল দূরে বসে যিনি একটি আধুনিক প্রগতিশীল রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেন, তিনি ঠিকই তাঁর কলমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে, সরকারের ভূমিকার বিরুদ্ধে।

অথচ এখনও প্রতিনিয়ত আমরা ‘তসলিমা নাসরিন’ নামটিকে অত্যন্ত সচেতন ভাবে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে মুক্তচিন্তা, বাক স্বাধীনতার কথা বলি। যিনি বাংলাদেশে নাস্তিকতা ও নারীবাদের সূচনা করেন, যিনি ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লেখার কারণে আজ ২১ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশে নিষিদ্ধ হয়ে আছেন, তাঁকে বাদ দিয়ে মুক্তচিন্তা করাটা আদৌ ফলপ্রসু হয়েছে বা হচ্ছে? যে মুক্তচিন্তা পুরুষতান্ত্রিকতা মুক্ত নয়, সে চিন্তাকে আমি মুক্তচিন্তা বলতে পারি না। এটা এক ধরনের ভন্ডামীর নামান্তর।তারা প্রকৃতপক্ষ ধর্মের কুসংস্কার থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলেও, নারীবিরোধী সংস্কারগুলো থেকে মুক্ত হতে পারেননি।

বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের তসলিমা বিষয়ে এমন নীরবতা আমাকে অবাক ও ক্ষুব্ধ করেছে। তাই ২০১৪ সালে, আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে ‘তসলিমা পক্ষ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ খুলি। তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত মিথ্যা অপপ্রচারগুলো সম্পর্কে মানুষকে জানানো, তসলিমা নাসরিনের লেখাগুলো মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়াই এই পেজের উদ্দেশ্য। পরবর্তীতে আমরা তসলিমা নাসরিনের জন্মদিনে, ‘তসলিমা দিবস’ উদযাপন করি। এছাড়াও তসলিমা পক্ষের আয়োজনে মুক্তচিন্তার পক্ষের মানুষদের নিয়ে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি প্রোগ্রাম হয় শাহবাগে। বর্তমানে দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে, অফলাইন প্রোগ্রামের ঘোষণা না দিয়ে অনলাইনেই তসলিমা নাসরিনের লেখা গুলো নিয়ে ছোট ছোট অনলাইন পোষ্টার বানিয়ে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, ধর্মান্ধ সমাজ নারীকে নানা ভাবে দমন করে এসেছে। নারীর কথাগুলো যাতে উচ্চারিত না হয় সে জন্যই উপামহাদেশের শ্রেষ্ঠ নারীবাদী লেখককে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নিষিদ্ধ করেছে। তসলিমা নাসরিনকে তাঁর নিজ ভূমি নির্বাসন দণ্ড দিলেও সভ্য দেশগুলো তাঁকে নানা ভাবে সম্মানিত করেছে। তসলিমা’কে নিষিদ্ধ করাতে তসলিমার খুব বেশি ক্ষতি না হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। তসলিমা নাসরিনের নির্বাসন কেবল একজন মানুষ তসলিমার নির্বাসন নয়, এটি মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা আর মানবাধিকারের নির্বাসন।

যেসব কথা বলা নিষেধ, সেসব কথাই তিনি জোর গলায় বলেছেন। যে শব্দ উচ্চারন করা মানা ছিল, সে শব্দই তিনি বারবার উচ্চারন করেছেন। আজ আমরা সেসব শব্দের-ভাষার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। তসলিমা নাসরিন এদেশের নারীদের কথা বলা শিখিয়েছেন, বাধা উপড়ে এগিয়ে চলতে শিখিয়েছেন। আজ আমরা কথা বলতে পারি, প্রতিবাদ করতে পারি। আমরা ভুলি নি তসলিমা নাসরিনকে। নিষিদ্ধ নামটিই আমরা গর্বের সাথে উচ্চারন করি। কারন এই নিষিদ্ধ নামেই আমরা আমাদের শক্তি খুঁজে পাই, প্রতিবাদ করার সাহস পাই।

বুধবার, ১ জুন, ২০১৬

ওরা দোষী নয়, ভুক্তভোগী


কয়েকদিন আগে মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের জিপিএ৫ প্রাপ্ত ছাত্রদের নিয়ে বানানো প্রতিবেদনটি সকলেই দেখেছেন। ভিডিওটি দেখে আসলেই খুব দুঃখ পেয়েছি। সাধারণ কিছু বিষয় আমরা পারি না! ক্ষোভে-দুঃখে একটি স্ট্যাটাসও দিয়েছিলাম স্টুডেন্টদের বিরুদ্ধে, পরবর্তীতে বুঝতে পেরেছি এটি করা আমার মোটেই উচিত হয়নি। নিজেও এসএসসি পাশ করেছি কিছু বছর আগে। তাই ওইসব ছাত্রদের প্রতি ছুঁড়ে দেয়া ঘৃণা আর অপমান আমার গায়েও এসে লেগেছে। অনেক সময় সাধারণ কিছু প্রশ্ন মানুষ নার্ভাস হয়ে ভুল করে ফেলে। এরকম কিছু ঘটনা আমাদের প্রায় সবার জীবনেই ঘটে থাকে। এ নিয়ে আমরা পরে মনে মনে হাসি। কিন্তু এসকল ছাত্রদের তো নিজেদের ভুলের কথা মনে করে নিজের মনে হাসার কোন উপায় নেই, সমগ্র দেশ তাদের নিয়ে হাসছে। এই অপমান সহ্য করতে না পারে তাদের কেউ যদি আত্মহত্যা করে এর দায় কি আমরা নিব?

পীথাগোরাসের উপপাদ্য আমরা পড়েছিলাম ক্লাস এইটে। আমাদের অংক বইয়ে উপপাদ্য ২৪ ছিল সম্ভবত পীথাগোরাসের উপপাদ্য। সেটা উপপাদ্য২৪ হিসেবেই লেখা ছিল। অংক বইয়ের কোথাও পীথাগোরাস কে, এ সম্পর্কে কোন তথ্য ছিল না। সেক্ষেত্রে কোন ছাত্র যদি জানতে না পারে যে সে, যেই উপপাদ্য২৪ লিখে পরীক্ষায় ভাল নম্বর পেয়েছে, সেটা আসলে পীথাগোরাসের সৃষ্টি তবে তাকে কিন্তু দোষ দেয়া যায় না। যেই সাংবাদিক পীথাগোরাস কে সেটা জিজ্ঞেস করেছেন, সেই সাংবাদিককে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, পীথাগোরাসের পুরো নাম কী? আমি নিশ্চিত তিনি উত্তর দিতে পারবেন না।

হুট করে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলে, স্বাধীনতা দিবস আর বিজয় দিবস গুলিয়ে ফেলবেন অনেকেই। আর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির নাম না জানাটা কোন অপরাধ না। রাষ্ট্রপতিকে বছরে কয়বার খবরের পাতায় পাওয়া যায়? আপনারাই ভাবুন। বর্তমান বাংলাদেশের বিরোধী দল কোনটি জানতে চাইলে ৮০ ভাগ মানুষ বলবে, বিএনপি। অথচ বর্তমান বিরোধী দল হল, জাতীয় পার্টি। বিরোধী দলের নেতার নামটি কয়জন পারবে এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে, বাংলাদেশে রওশন এরশাদকে কয়জন চেনে?

হুমায়ুন আহমেদের ‘আজ রবিবার’ নাটকটিতে দাদু ক্যারেক্টারটি তার নাতনী টাইপের একজনকে কোন একটা প্রশ্ন করে, নাতনী সেটার উত্তর দিতে পারে নি। এ নিয়ে দাদু সম্ভবত নাতনীকে ‘কিছুই পারিস না’ জাতীয় কিছু কথাবার্তা বলছিলেন। এরপর নাতনী দাদুকে একটা প্রশ্ন করে, দাদু সেটার উত্তর দিতে পারে নি। তখন নাতনী দাদুকে বলে, আমি যেমন অনেককিছু জানি না, তুমিও তেমন অনেক কিছুই জানো না। মুস্তাফিজ’কে তার বোলিং প্রতিভার জন্য মাথায় মুকুট পরাচ্ছি। তারকা খেলোয়াড় মুস্তাফিজকে যদি ওই প্রশ্নগুলো করা হতো, তাহলে তিনিও এসকল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না। তাঁকে এসব প্রশ্নের উত্তর পারতেই হবে, এমন কোন কথা নেই। তিনি যেই বিষয়ে দক্ষ, সেই বিষয়ে তিনি সেরা। প্রত্যেকেরই নিজের কোন আগ্রহের বিষয় থাকে। নিজের পছন্দের সাবজেক্টে সবাই সেরা। অথচ আমরা সবাইকে সব বিষয়ে সেরা হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেই। সবাইকে কেন সবকিছু পারতে হবে?

তের জনেকে ১০ টি করে প্রশ্ন করা হলে, এরমধ্যে ছয়জন যদি ছয়টি প্রশ্নের উত্তর ভুল করে, তবে এখানে অস্বাভাবিক কিছু তো দেখি না। ক্যামেরার সামনে নার্ভাস হয়ে আমি হলে তো কথাই বলতে পারতাম না। জানি, অন্যকে অপমানিত হতে দেখা আমাদের জন্য খুবই আনন্দদায়ক। অন্যের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে একবার ভেবে দেখুন বিষয়টা। তাহলেই বুঝতে পারবেন।

প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অন্যদেরকে করা সব প্রশ্নের উত্তর আমি পারতাম কিন্তু নিজেরটার উত্তর ঠিকমত দিতে পারতাম না। একবার বায়োলজি পরীক্ষার প্র্যাক্টিক্যালে, আমার আগের রোলের স্টুডেন্টটি’কে তেলাপোকার বৈজ্ঞানিক নাম জিজ্ঞেস করা হলে, সে তেলাপোকার ইংরেজি বলে। শুনে আমি হেহে করে হেসে ফেলি, কারণ তেলাপোকার বৈজ্ঞানিক নাম আমি জানি। কিন্তু যেই মুহূর্তে, টিচার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হাসলে কেন? তুমি বলতো এটার উত্তর? আমি ঘটনার আকস্মিকতায় ও টিচারের ঝাড়ি শুনে পুরাই ব্ল্যাংক হয়ে যাই, পারিনি উত্তর দিতে। এরকম হয়। এটা অস্বাভাবিক কিছু না। পরীক্ষায় পাশের জন্য শ’খানেক বৈজ্ঞানিক নাম, (বেশিরভাগ মূলত ল্যাটিন শব্দ) মখস্থ করলেও, তেলাপোকা ছাড়া অন্যকোন কিছুর বৈজ্ঞানিক নাম আমার এই মুহূর্তে মনে নেই।
আমার বাসার ক্যামিস্ট্রি স্যার আমাকে পড়া জিজ্ঞেস করতেন প্রতিদিন, একটা প্রশ্নে আটকে গেলে দাঁড় করিয়ে রাখতেন, বলতেন এক পা তুলে দাঁড়াও, এরপর বলতেন, দুই পা তুলে দাঁড়াতে পারলে শাস্তি মাফ করে দিবো, দাঁড়াও তো। দুই রুমের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে আমাকে নিয়ে তিনি এসব মজা করতেন। পাশের রুমে আমার ছোট বোনের টিচার পড়াতেন। আমার ছোট বোন হাসতো, তার টিচার হাসতেন। আমার রাগ হতো, কিন্তু করার কিছুই ছিলও না। শেষে, আমি ঠিক করি, আমি আর পড়া শিখব না। স্যার পড়া জিজ্ঞেস করার আগেই, ‘সরি, পারব না’ বলে আমি কানে ধরে দাঁড়িয়ে যাই। তারপর স্যারকে জিজ্ঞেস করি, স্যার পা তুলে দাঁড়াব নাকি উঠ বস করব। এরপর আমার বাবা মা সেই টিচার’কে বাতিল করতে বাধ্য হয়। ওই সময়টুকু আমি প্রচণ্ড এক মেণ্টাল টর্চারের মধ্যে ছিলাম। স্যার নানারকম অদ্ভুত কথাবার্তা বলতেন, মজা নিতেন, আর আমাকে নানাভাবে বিব্রত করার চেষ্টা করতেন। এরকম মেণ্টাল টর্চারের মধ্যে বাংলাদেশের অনেক স্টুডেন্টই দিন পার করছে। আমার এক ভাইয়ের তো মানসিক সমস্যা শুরু হয়েছে, পড়ার চাপ আর বাবা-মা-শিক্ষকদের দুর্ব্যবহারের কারণে।

আমি যখন কলেজে পড়তাম, তখন আমি কলেজের জন্য বাসা থেকে বের হতাম, সকাল সাড়ে ছয়টায়। ফিরতাম দুপুর সাড়ে তিনটায়। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে সাড়ে চারটার দিকে পরিশ্রান্ত হয়ে যেতাম। কিন্তু ছয়টায় আবার ক্যামিস্ট্রি স্যার, মাঝখানের সময়টুকু স্যারের পড়া শিখে নিতাম। ছয়টা থেকে আটটা সেই স্যার পড়িয়ে গেলে, নয়টা থেকে এগারোটা আরেকজন স্যার পড়াতেন ফিজিক্স ও ম্যাথ। এরপর স্যারের হোমওয়ার্ক, কলেজের হোমওয়ার্ক করে, খেয়ে দেয়ে গভীর রাতে কম্পিউটার নিয়ে বসতাম। ঘুমাতে ২টা বাজুক কিংবা ৪টা, উঠতে হবে ছয়টা বাজার পনের মিনিট আগে। এই ছিল আমার ডেইলি রুটিন। এটা কেবল আমার না, বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থার শিকার প্রতিটি স্টুডেন্টের ডেইলি রুটিন। আমি ফাঁকিবাজ টাইপের স্টুডেন্ট ছিলাম বলে, এরমধ্যেই সময় বের করে নিতাম নিজের জন্য। আর কলেজের সময়টুকু পুরোটায় বন্ধুদের সাথে আনন্দ করে কাটাতাম বলে এইরকম কঠিন অবস্থায়ও মুখে হাসি ছিলও। ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, কড়া নিয়মকানুন, আর নিয়ম ভাঙতে পারার আনন্দটাই ছিল অন্যরকম।

মুখস্থ করার কাজটা আমাকে দিয়ে হতো না। আমার ফিজিক্স স্যার লক্ষ্য রাখতেন, পড়া লেখার চাপে যেন আমার মানসিক কোন রোগ সৃষ্টি না হয়, আমি যেন কোনভাবে হতাশ না হই। স্যারের জীবনে এমন ঘটেছিল। স্যারের এক স্টুডেন্টেরও পড়ার চাপে মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের কলেজের অনেক ব্রিলিয়েন্ট স্টুডেন্টই মানসিক কোন সমস্যায় ভুগছে বলে মনে হতো। তাদের সারাদিনের কথাবার্তার বিষয় কেবল পড়া, কে কত নম্বর পেলো, সবচেয়ে বেশি যে পেয়েছে সে কোন স্যারের কাছে পড়ে, সে কোন টেস্ট পেপার ফলো করে.. এসব। আমাদের স্কুলের ফার্স্ট গার্লকে আমি কখনো কথা বলতে দেখিনি, সারাদিন বইয়ের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে ‘বিড়বিড়’ করতো।
এসকল কথা বলছি কারণ, অনেকের মনে হতে পারে, বর্তমানে গোল্ডেন জিপিএ৫ এসব পাওয়া কোন ব্যাপার না, না পড়লেও পাওয়া যায়, আসলে তা নয়। আমি এও প্রমাণ করতে চাইছি না যে, জিপিএ৫ পাওয়া ছাত্ররা একেকজন মেধায় অনন্য। তবে এখনের স্টুডেন্টরা পড়ালেখার পিছনে যেই সময় ব্যয় করে আমাদের বড়রা কিন্তু এত সময় মোটেই ব্যয় করতেন না। তারা বিকেল হলে মাঠে ঠিকই খেলতে যেতেন। এখন খেলার মাঠ কই? আর সময় কই? রেজাল্ট যাইহোক, সেটার পিছনে ছুটতে গিয়ে বর্তমানে স্টুডেন্টরা তাদের শৈশব-কৈশোরের আনন্দময় সময় গুলো হারিয়ে ফেলছে। একধরণের বিশ্রী প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদেরকে ব্যস্ত রেখে প্রকৃত শিক্ষা থেকে অনেক দূরে রয়েছি আমরা। এজন্য মোটেই স্টুডেন্টরা দায়ী নয়, দায়ী শিক্ষাব্যবস্থা। দায়ী আমাদের শিক্ষকেরা, আমাদের বড়রা।
লেখাপড়াটা আমাদের কাছে ভয়ের বা যনন্ত্রনার বিষয়। লেখাপড়া কি আসলেই তাই? মোটা মোটা বই মুখস্থ করে, সেসব পরীক্ষার খাতায় বমি করাটাই কি শিক্ষা? মুখস্থ নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় আপনারা এরচেয়ে ভালো কিছু আশা করেন কী করে? স্টুডেন্টদের ভুল নিয়ে হাসাহাসি না করে বরং এ থেকে পরিত্রাণের কার্যকরী কোন উপায় বের করাই আমাদের গুরুজনদের দায়িত্ব। দায়িত্ব এড়িয়ে কেবল কয়েকজন শিক্ষার্থীর অজ্ঞতা নিয়ে উপহাস করলে আপনাদের প্রতি ছাত্রদের আস্থার জায়গাটি আর থাকবে না।

রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

শ্যামল কান্তি : মালাউন থেকে শিক্ষক হয়ে উঠার কাহিনী

নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত বর্বরতম নিপীড়নের শিকার হয়েছেন স্কুল কমিটি ও স্থানীয় সাংসদ সেলিম ওসমান দ্বারা। তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা গুজব রটিয়ে একদল লোক তাকে শারীরিকভাবে আঘাত ও অপমানিত করেছেন। শিক্ষক শ্যামল কান্তি ধর্ম অবমাননা করেছেন কিনা প্রথম ক’দিন এ নিয়ে স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। তাই সবাই ধরে নিয়েছে, নিশ্চয়ই ওই মালাউন ব্যাটা আমাদের আল্লাহ রসুলকে নিয়ে কটুক্তি করেছে। কাজেই তাকে যা করা হয়েছে, তার অপরাধের তুলনায় তা কিছুই না।

তারপর সাংবাদিকেরা তাদের ক্যামারায় খবর নিয়ে এলেন যে, শ্যামল কান্তি ধর্ম নিয়ে কোনো ধরণের মন্তব্য করেননি। যেই ছাত্রের অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে অপমানিত করা হয়েছিলো, সেই ছাত্রই পরবর্তীতে ক্যামেরার সামনে বলেছে, “স্যার ধর্ম নিয়ে কিছু বলেননি”। শিক্ষক শ্যামল কান্তি ধর্ম নিয়ে বলেছেন, এলাকাবাসীও এরকম কিছুর প্রমাণ পাননি বলে জানিয়েছেন।

বিষয়টির সাথে নাস্তিকতা জাতীয় ভয়ংকর কোনো কিছুর সম্পর্ক না থাকায় মডারেট মুসলমানগণ ধীরে ধীরে মুখ খুলতে শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ নিজেদের কানে ধরা ছবি দিয়ে শ্যামল কান্তির এমন দুরবস্থায় তার পাশে আছেন বলে জানিয়েছেন, তার প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু হলো, সেলিম ওসমান নামের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ট্যাগ থাকায়, অনেকেই সেলিম ওসমানের শাস্তি দাবী করতেই শ্যামল কান্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। হুজুগে বাঙালি, যারা ১২ ঘন্টা আগে মালাউন শ্যামল কান্তির ফাঁসির দাবী করছিলো, তারাই আবার ঢেউয়ের তালে তাল মিলিয়ে শ্যামল কান্তির পক্ষ নিয়েছেন। এভাবেই মালাউনের বাচ্চা থেকে ধীরে ধীরে শ্যামল কান্তি হয়ে গেলেন, আমাদের শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত।

যেহেতু জনগণ শ্যামল কান্তির পক্ষে নিয়েছেন, কাজেই সরকারের মন্ত্রী এমপিরাও ধীরে ধীরে এ বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হলো। এটা তো তার প্রাপ্য। কিন্তু অপরাধীদের প্রাপ্যটার তবে কী হবে?

একবার ভাবুন, যদি প্রমাণ করা না যেতো যে শ্যামল কান্তি আসলে ধর্ম নিয়ে কিছুই বলেননি, কিংবা যদি প্রমাণ হতো যে, শ্যামল কান্তি আসলেই ধর্ম নিয়ে কিছু বলেছেন, তবে এইসব প্রতিবাদী কন্ঠরা কিন্তু মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকতেন। আর বেচারা শ্যামল কান্তির পরিণতি হতো রাজীব, অভিজিৎদের মতো। প্রতিবাদের তো প্রশ্নই উঠে না, বরং অনেকে সুর তুলতেন, ‘ধর্ম নিয়ে কটুক্তি বরদাস্ত করা হবে না’।

শ্যামল কান্তির ইস্যু নিয়ে যখন আমরা প্রতিবাদ করছি, ঠিক তখন নিবন্ধন পরীক্ষা দিতে গিয়ে প্রধান শিক্ষক দ্বারা ধর্ষণের শিকার হলেন একজন শিক্ষিকা। যেহেতু হুজুগে বাঙালি তখন অন্য ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত তাই এইদিকে নজর দেয়ার সময় হয়নি। আর কয়েকদিন আগেই তো তনু ধর্ষণের ইস্যু নিয়ে প্রতিবাদ হলো, এখন নতুন কিছু নিয়ে প্রতিবাদ করা যাক, ধর্ষণের ইস্যু তো পুরাতন।

এরপর ঢাকার ধামরাইয়ে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকাকে টয়লেট থেকে বের করে মারধর ও লাঞ্ছিতের অভিযোগ উঠেছে ওই বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতির বিরুদ্ধে। না, এই বিষয়েও কারও প্রতিবাদ নেই, কাজেই সরকারের কারও এই নিয়ে মুখ খোলার কিংবা কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন হয়নি।

শ্যামল কান্তি ইস্যুটা থেকে ফায়দা লুটতে এখন আবার হেফাজতে ইসলাম মাঠে নেমেছে, দেখা যাক শেষ পর্যন্ত নাটক কোনদিকে মোড় নেয়।

কিছুদিন আগে তনু হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে দেশ উত্তাল ছিলো। ময়না তদন্তে প্রথমে ধর্ষণের কোনো আলামতই পাওয়া গেলো না। পরে প্রতিবাদের অবস্থা বুঝে, ময়নাতদন্ত পাল্টে গেলো। দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তে তনুর কাপড়ে দুইজনের বীর্য পাওয়া গেছে বলে জানা যায়।

এসব ঘটনাগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে গিয়ে কিছু বিষয় মাথায় এসেছে। প্রথমে যেকোনো অন্যায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়। এরপর যদি দেখা যায়, ওই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাতি সোচ্চার, তখন সেটিকে অন্যায় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং সরকার-প্রশাসন এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

২০১৩ সালে কাদেরমোল্লাকে যাবজ্জীবন দেয়ার কথা কি মনে পড়ে আপনাদের? জনগণ এই রায়ের বিরুদ্ধে গেলে পরবর্তীতে কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ হয়, দণ্ড কার্যকরও হয়। যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে যদি জনগণ এক না হতো, তবে কিন্তু এসব ভয়ংকর অপরাধীদের কারও ফাঁসি হতো না।

দেখা যাচ্ছে, যেই ইস্যুতে জনগণ সোচ্চার হয়, প্রতিবাদী হয়, সেই ইস্যুতে সরকার কোনো একটা ব্যবস্থা নেয়। এখনও পর্যন্ত যেই ইস্যুতে জনগণের কোনো প্রতিবাদ দেখা যায়নি, তা হলো নাস্তিক মুক্তমনাদের হত্যা। কাজেই এগুলো এখনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই রয়ে গেছে। আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি, জনগণ যদি নাস্তিক হত্যার প্রতিবাদে রাস্তায় নামে, তবে নাস্তিক হত্যার বিচার করার ব্যাপারেও সরকার পদক্ষেপ নেবে।

ইসলাম ধর্মে নাস্তিক হত্যার নির্দেশ দেয়া আছে, এরকম রেফারেন্স হাজির করলে বলা হয়, ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলাম ধর্মে এসব বলা হয়নি, এসব সহিহ অনুবাদ নয়, ইসলাম হত্যাকে সমর্থন করে না’। ইসলাম যদি হত্যাকে সমর্থন না করে, তবে একের পর এক নাস্তিক প্রগতিশীলদের হত্যায় শান্তিকামীদের কোনো প্রতিবাদ দেখি না কেন? ইসলাম যদি এতোই শান্তির ধর্ম হয়, তবে ‘নাস্তিক হত্যা ওয়াজিব হয়ে গেছে’ নাস্তিকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দাতাদের বিরুদ্ধে কেন ইসলাম অবমাননার অভিযোগ উঠে না? কেন প্রকাশ্যে এসব হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করেন না? এই কেন-এর উত্তরটা নিজেই বুঝে নিন, আবার রেফারেন্স দিতে পারবো না।

এখন আবার নতুন নাটক, ছয় জঙ্গিকে ধরতে পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে। যেহেতু একের পর এক মুক্তমনা হত্যার পর সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে উন্নত দেশগুলো, তাই সরকার এটি নিয়ে কিছুটা চাপের মধ্যেই আছে বলা যায়। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে এখন সরকার জানিয়ে দিলো যে, আমরা নাস্তিক হত্যার বিষয়গুলো এতোটাই সিরিয়াসলি নিচ্ছি যে, জঙ্গি সনাক্ত করে এখন খুঁজে বের করার জন্য মরিয়া হয়ে লাখ টাকার পুরষ্কার পর্যন্ত ঘোষণা করে ফেলেছি। আর কী চাও তোমরা?

আর যেসব জঙ্গিকে হাতে নাতে ধরা হলো, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হলো? বাবু হত্যায় দুই জঙ্গিকে ধরে দিয়েছিলো ভিন্ন লিঙ্গের দুইজন মানুষ। ওই দুই জঙ্গির অপরাধীর কোনো শাস্তি না হলেও খুনি ধরিয়ে দেয়ার অপরাধে সেই ভিন্ন লিঙ্গের দুজনকে হুমকির মুখে ঢাকা ছাড়তে হয়েছে। অভিজিতের খুনীদের নাকি চিহ্নিত করা হয়েছে, নজরদারিতে রয়েছে, এরকম খবর শুনে আসছিলাম। এরপর খবর এলো, খুনীরা বিদেশে পালিয়ে গেছে।

হয়তো শিক্ষক লাঞ্ছনার ইস্যু চাপা দিতেই এই জঙ্গি শনাক্ত ও পুরস্কারের নাটক শুরু হলো। এতে ইস্যু চাপা পরলে তো খুব ভালো। নয়তো একটা নাস্তিক কিংবা প্রগতিশীল কাউকে বলি করা হবে। পুরাতন ইস্যু পাল্টে নতুন ইস্যু হেডলাইনে আসতে বাধ্য।

জুম্মাবারের আপডেট, কুষ্টিয়া সদরের বটতৈলে সানোয়ার রহমান নামে এক হোমিও চিকিৎসককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। জানা যায়, নিহত ‌‌সানাউর রহমান একজন বাউল ভক্ত ছিলেন। একসময় বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একটা হোমিও দোকান দিয়েছিলেন যেখানে বিনা পয়সায় চিকিৎসা সেবা দেয়া হতো। তার দোকানে সম্ভবত প্রগতিশীল ও বাউলতত্বে বিশ্বাসী লোকজনের আড্ডা হতো। দেখা যাক, এই ইস্যু নিয়ে কী ধরনের নাটক হয়।

এভাবেই ইস্যু যায়, ইস্যু আসে। এসব ইস্যুর স্রোতেই আমরা হারিয়েছি রাজীব, অভিজিৎ, বাবু, অনন্ত, নীল, দীপন, নাজিমউদ্দীন, রেজাউল করিম, জুলহাজ, তনয়, সানোয়ারদের….

পুরুষের আত্মত্যাগ গৌরবের, নারীর আত্মত্যাগ লজ্জার!

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের গৌরবের ইতিহাস। মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের দেশের বীর সন্তান। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক লেখা আছে অনলাইনে। আমি সেসব আবার নতুন করে বলতে চাই না। আজ আমার লেখার বিষয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে উপেক্ষিত একটি অংশ।

বীরাঙ্গনা। যারা একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদরদের দ্বারা নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে গর্ববোধ করেন। নিশ্চয়ই এটি গর্বের বিষয়। কিন্তু জানেন কি বীরাঙ্গনা পরিচয়টি আমাদের সমাজে, লজ্জা ও অপমানের। যুদ্ধ প্রক্রিয়ার কৌশলগত দিক হিসেবে নির্যাতিত হয়েছেন এইসব বীর নারীরা, নিঃসন্দেহে তারা মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু এই বীর নারীরা কী পেয়েছে স্বাধীন দেশটির কাছ থেকে ঘৃণা আর অপমান ছাড়া?

যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হল, এক বুক কষ্ট-দুঃখ-যন্ত্রণা নিয়ে বীরাঙ্গনারাও তাদের আপনজনদের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু হায়! ধর্ষকেরা নাকি তার ইজ্জত নষ্ট করে ফেলেছে, তার আর ইজ্জত নেই, কাজেই স্বামী তাকে ঘরে তুলবে না। হ্যাঁ, বেশির ভাগ নারীর সাথে এটিই ঘটেছিল। তারা বাড়ি হারা, স্বামী হারা, সন্তান হারা হয়েছেন এই স্বাধীন দেশে। কতটা নির্মম, কতটা বর্বর জাতি আমরা, ভাবতে পারেন?

বঙ্গবন্ধু এসকল বীর নারীদের জন্য ‘নারী পুনর্বাসন’ অফিস খুলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেসবও বন্ধ হয়ে গেল। তাদের অনেকে মানুষের বাড়িতে কাজ করে নিজের জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করেছিলেন। সেখানেও অনেককে কুকুরের মত তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের সম্পর্কে এলাকায় কথা বলতে গেলেই, মুক্তিযুদ্ধে তাদেরকে পাক বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে কয়জন কী করেছে, সেসব কথা আগে উঠে আসে। এসবই তাদের পরিচয়। তাদের জীবন ঠিক ওই সময়টাতেই থেমে আছে।

এক বীরাঙ্গনা মায়ের মেয়ের বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল তার বীরাঙ্গনা পরিচয়ের কারণে। অন্যদিকে আমাদের পরিবারে কেউ মুক্তিযোদ্ধা থাকলে সেই সার্টিফিকেটের সুবিধা নিয়ে সেরা স্কুল-কলেজে ভর্তি হই। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরী নিই। অন্যদিকে বীরাঙ্গনার সন্তানের, বীরাঙ্গনা কোটায় বিয়ে ভেঙে যায়। বেগম খালেদা জিয়া, হোক তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, আমরা কিন্তু ৭১এ তাকে ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার ধর্ষণ করাকে মজার কোন বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে মুখ টিপে হাসি।

একাত্তরে তাদের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায় আচরণ তাদেরকে যতটা না কষ্ট দেয়, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি কষ্ট দেয়, যুদ্ধের পর পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়া নির্যাতন,বঞ্চনা ও উদাসীনতা। সমগ্র জীবন তারা পার করে দিলেন, এক বুক বেদনা নিয়ে। সমাজের বাঁকা চোখ তাদেরকে বাধ্য করছে, মানবেতর জীবনযাপন করতে। যেন বীরাঙ্গনা হওয়া অপরাধ। দেশের জন্য পুরুষের আত্মত্যাগ মহান হলেও, নারীর আত্মত্যাগ লজ্জার।
একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামে শোক গাঁথার অন্যতম অধ্যায় বীরাঙ্গনা। যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা সহ সমস্ত ক্ষতিগ্রস্তরা বিভিন্ন সময় আলোচনায় এলেও সবসময় উপেক্ষিত থেকে গেছেন বীরাঙ্গনারা। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বইগুলোতেও এসকল বীর নারীদের আত্মত্যাগের কথা খুব বেশি পাওয়া যায় না। ব্লগে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখা হয়। বীরাঙ্গনাদের ব্যাপারে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু একটি বাক্য থাকে, ‘২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম হানি’ দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম হানি মোটেই ঘটে নি। সম্ভ্রম যোনির ভেতরে থাকে না।

দুই লক্ষ মা-বোনের সাথে কী ঘটেছিল ৭১ এ, সেসব বলে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনীকে আমরা আরও লোমহর্ষক ভাবে উপস্থাপন করি, পাক হানাদারদের নির্মমতাকে বুঝানোর জন্য ধর্ষণের কথা তুলে ধরি, কিন্তু যুদ্ধের পর তাদের সাথে কী ধরণের নির্মম আচরণ করেছি নিজেরা, এজন্য কি আমাদেরকে কেউ নির্মম- অকৃতজ্ঞ - বর্বর জাতি বললে, খুব বেশি ভুল বলা হবে?

বীরাঙ্গনার সংখ্যা নিয়েও আছে দ্বন্দ্ব। তখনকার সরকারি জরিপ মতে বীরাঙ্গনাদের সংখ্যা ২ লাখ। সেই সময়ের নির্যাতিত নারীদের গর্ভপাতের চিকিৎসার কাজে বাংলাদেশে এসেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার জেফ্রি ডেভিস। নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও গ্রাম প্রতি গর্ভপাতের গড় হার হিসেব করে তিনি প্রমাণ করেছেন, এই সংখ্যা সাড়ে ৪ লাখের বেশি, যাদের বেশির ভাগেরই বয়স ছিল ২০ বছরের নিচে।

সাড়ে চার লাখ বীরাঙ্গনাদের অনেকেই হয়তো আজ বেঁচে নেই। যারা বেঁচে আছেন, তারা আজ মুখ লুকিয়ে থাকেন, বীরাঙ্গনা পরিচয় কাউকে জানাতে চান না। কারণ পাকিস্তানিদের বর্বরতা তাঁরা দেখেছেন, কিন্তু বর্বরতার দিক থেকে বাঙ্গালী জাতিও যে কোন অংশ কম নয়, সেটাও তাঁরা হাড়েহাড়ে টের পেয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ৪০ বছরের বেশি সময় পর আওয়ামীলীগ সরকার বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে প্রাথমিক ভাবে ৪১ জন নারী মুক্তিযোদ্ধার নাম গ্যাজেট হিসেবে প্রকাশ করে, আরও ৫০০ জনের একটি তালিকা তদন্তাধীন রয়েছে। সরকারের উচিত দ্রুত সকল বীর নারীদের নাম প্রকাশ করে তাদের ভাতার ব্যবস্থা করা সাথে তাদের সন্তানদেরকেও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে, সকল সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা।

স্ব ভূমির জন্য আত্মত্যাগ লজ্জার নয়, গৌরবের। ইতিহাসে উপেক্ষিত এসব নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি হতে পারে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অনন্য দলিল।

এখন এসবের মূল নিয়ে কথা বলা যাক। কিছুদিন আগে সাবিরা নামের এক নারী মডেল আত্মহত্যা করেছে ঠিক একই কারণে। প্রভা-রাজীবের ঘটনা তো আমরা জানি, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সবাই ছি ছি করেছে প্রভাকে, রাজীবকে নয়। হ্যাপি-রুবেলের কাহিনীতে রুবেল কিন্তু আমাদের হিরোই থেকে গেছে, নষ্ট হয়েছে হ্যাপি।

ধর্ষণ সেটা মুক্তিযুদ্ধে করা হোক কিংবা স্বাধীন দেশে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ধর্ষিতা মানেই, ইজ্জত-সম্ভ্রম নষ্ট হওয়া এক নারী। পুরুষের ইজ্জত-সম্ভ্রম তাদের কর্মে, চিন্তায়, জ্ঞানে। নারীর ইজ্জতটা তবে কোথায় থাকে? কোন অসভ্য পুরুষের নষ্টামির ফল কেন একটি মেয়েকে বয়ে বেড়াতে হবে? দুজন মানুষের স্বেচ্ছায় যৌন মিলনে পুরুষের কিছু না হলেও নারীর ইজ্জত যায় কেন? কীভাবে?

এইসব প্রশ্ন দূর হয়ে যাবে, সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, নারীকে মানুষ ভাবতে পারলে। কোন অংশে কম মানুষ কিংবা দুর্বল প্রজাতির কিছু ভাবলে এসব সমস্যা চলতেই থাকবে। কিন্তু পুরুষের চিন্তার দৈন্যতার কারণে নারীকে আজও তারা মানুষ ভাবতে পারে না। আর কতকাল ‘আমরাও মানুষ’ ‘আমরাও পারি’ ‘নারী মায়ের জাত, মায়ের জাতকে সম্মান করো’ ইত্যাদি ন্যাকা ন্যাকা কথা বলে সম্মান ভিক্ষা চলবে? পুরুষের চেতন ফেরাতে হলে আঘাতের বিপরীতে পাল্টা আঘাতের বিকল্প কিছু আছে কি?

শুক্রবার, ১৩ মে, ২০১৬

ভেদাভেদের মাধ্যম রেজাল্ট!

ক্লাস টেনের কেমিস্ট্রি ক্লাস চলছে। মোটু পাতলু দুই বন্ধু সদ্য নাইন পাশ করে ক্লাস টেনে উত্তীর্ন হলো। কেমিস্ট্রি স্যার প্রায় দুই সপ্তাহ পড়িয়ে একটি অধ্যায় শেষ করেছেন। এবার পড়া নেয়ার পালা। স্যার সামনের কয়েকজনকে প্রশ্ন করে সঠিক উত্তর না পেয়ে হতাশ হয়ে সারা ক্লাসকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘এতোদিন ধরে আমি কী পড়িয়েছি তোমাদের’ বলে স্যার মাইক্রোফোনটা পড়া না পারা একজন স্টুডেন্টের কাছে দিয়ে বললেন, ‘নাও স্যার, এটা দিয়ে আমাকে মারো, আমি তোমাদেরকে পড়া বোঝাতে ব্যর্থ’। ওই স্টুডেন্ট লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখলো। এরপর স্যার একে একে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে চলেছেন, আর যারা পারছে না তাদেরকে মাইক্রোফোন হাতে দিয়ে বলছেন, ‘আমাকে মারো’ আর স্টুডেন্টরা লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মোটু পাতলুর ব্যাপারটা খুব পছন্দ হয়েছে, ওরা ঝটপট একটা প্ল্যান করে নিলো। এরপর স্যার একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বললেন, কে পারবে? ওদের আশেপাশের সব স্টুডেন্টকে মোটু শিখিয়ে দিলো যাতে সবাই পাতলুর নাম নেয়। তাই হলো, সবাই পতলুর নাম বললো। স্যার সাবাসি দিতে দিতে পাতলুর দিকে মাইক্রোফোন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সামনের বেঞ্চের কয়েকজন বলে উঠলো, ‘স্যার ও পড়া পারবে না’। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘ও পড়া পারবে না, তুমি কীভাবে জানো? নিজে পারো না সেটা বলো’। স্টুডেন্টটি বললো, ‘স্যার, আপনি পড়া না পারলে মাইক্রোফোন দিয়ে আপনাকে মারতে বলেন, তাই ওরা আপনাকে পড়া জিজ্ঞেস করতে বলছে, যাতে ও পড়া না পারলে, মাইক্রোফোন দিয়ে আপনাকে…..’। স্যার থামিয়ে দিলেন তাকে। স্তম্ভিত হয়ে গেলেন, এরকম কিছু হতে পারে স্যারের কল্পনাতেও আসেনি। এবার স্যার মোটু পাতলু গ্যাংয়ের দিকে তাকালেন, ওদের চোখ-মুখের ভাষা পড়েই বুঝে ফেললেন ওদের উদ্দেশ্যটা আসলে কী ছিলো। গম্ভীর মুখ করে স্যার বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না, দুষ্টু স্টুডেন্টদের কাণ্ড দেখে হেসে ফেললেন। ক্লাসটা শেষ হলেই মোটু-পাতলু গ্যাং সামনের বেঞ্চের স্টুডেন্টদের উত্তম মধ্যম দিয়ে গেলো, ওদের কারণেই স্যারকে মারার প্ল্যানটা তাদের নষ্ট হয়ে গেলো। এই হলো ক্লাসে সবচেয়ে ফাজিল মোটু,পাতলু ও তাদের গ্যাং। স্কুল তাদের খুব প্রিয়। কারণ স্কুলে তারা কেউ লেখাপড়া করে না; আড্ডা, ফাজলামো করেই কাটায়।

এবার বলি পাতলুর কথা। পাতলুর পড়ালেখা বলতে মূলত সেটা বাসার স্যারের কাছেই। স্যার হোমওয়ার্ক দেয়, পরদিন জিজ্ঞেস করে, ‘হোম ওয়ার্ক করেছো?’ পাতলু প্রতিদিন হোমওয়ার্ক না করার নিত্যনতুন অজুহাত দেখায়। অজুহাতের ঝুড়ি যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন একদিন সে স্যারকে বললো, ‘আচ্ছা স্যার, এটা তো আমারই হোম, আমি তো এখনও চাইলে কালকের পড়াগুলো এখানেই শেষ করতে পারি, এটা তো হোমওয়ার্কের মধ্যেই পরে’। স্যার বেচারা আর কী করবেন। বললেন, ‘ঠিকই তো, এটা তো তোমারই হোম, তোমার হোমে যখনই করো, সেটাকে তো হোমওয়ার্কই বলতে হবে, ঠিক আছে, করো’।
স্কুলে রেজাল্টের পর তার বাবা-মা যখন হিসেব দিতে শুরু করে যে, তার পিছনে কত টাকা খরচ করা হয়েছে, আর সে কিনা এই রেজাল্ট করল? তখন পাতলুর উত্তর, ‘আমি কি বলেছিলাম নাকি আমার জন্য এত টাকা খরচ করতে? তোমাদের ভালো রেজাল্টের প্রতি লোভ তাই করেছো, আমার তো ওসব লোভ নেই। তোমার লোভ করেছ, লোভে পরে লস খেলে, আমি কী করব?’

লেখাপড়া-রেজাল্ট ব্যাপারগুলোকে তাদের বাবা মায়েরা যতোটা সিরিয়াসলি নেন, তারা ততোটাই অবেহলা করে।  এসএসসির আগে মোটু পাতলু একটা কোচিংয়ে ভর্তি হয়। সেখানে প্রতিদিন দুইটা সাবজেক্টের পরীক্ষা নেয়া হয়। আর পাতলুর বাবা প্রতিটা পরীক্ষার খাতা নিয়ে গবেষণা করেন, প্রতিটা খাতার নাম্বার টুকে রাখেন, কোনটাতে কেমন উন্নতি-অবনতি হচ্ছে, অবনতি কেন হলো, সেসব নিয়ে বাসার স্যারদের নিয়ে মিটিং বসান। কোনো কারণে একটা পরীক্ষা দিতে না পারলে পরদিন কোচিং থেকে প্রশ্ন নিয়ে এসে বাবা বাসায় পরীক্ষা নেন। আর এদিকে পাতলু কোচিংয়ে নিয়মিত পরীক্ষা দেয় না। সংগঠন করে বেড়ায়, এছাড়া পড়ালেখার চাপে অতিষ্ঠ হয়ে প্রায়ই এদিক সেদিক ঘুরতে চলে যায় তারা। কিন্তু পাতলুর বাসায় তো খাতা দেখাতে হবে। তাই কোচিংয়ের সিল দেয়া কিছু খাতা যোগাড় করে সেসবে নিজে লিখে, নিজেই নাম্বার বসিয়ে পাতলু তার বাবাকে সন্তুষ্ট করে। 

কিন্তু এরপর কোচিংয়ে নিয়ম করা হলো এক সপ্তাহের সব পরীক্ষার রেজাল্ট দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়া হবে। পাতলু পরলো মহাবিপদে। এখন থেকে তো সব পরীক্ষা সিরিয়াসলি দিতে হবে। নিয়মিত পরীক্ষা দেয়া শুরু করলো তারা। কিন্তু পরীক্ষায় এতো কম সময় দেয়া হয় যে, টাইমের মধ্যে লেখা শেষ করা সম্ভব হয় না। তাই মোটু অবজেক্টিভ দাগিয়ে পাতলুকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তার শিট দিয়ে দেয়, আর পাতলু সৃজনশীল লেখে। মোটুর বাসায় পরীক্ষা নিয়ে কারো মাথাব্যাথা নাই। কোচিংয়ে পরীক্ষা চলাকালীন সিসিটিভির দিকে কড়া নজর রাখেন একজন স্যার, আর গার্ড তো আছেই। এভাবে রোবোটিক সিস্টেমে পরীক্ষা দিতে দিতে একপর্যায়ে তারা বিরক্ত হয়ে গেলো। তারপর তারা কোচিংয়ের কয়েকজনকে ধরলো। পাতলুর বায়না, ‘তোরা আমার নামে পরীক্ষা দিবি’। মাঝেমাঝে ওরা কোচিংয়ে না গিয়ে, প্রক্সি পরীক্ষার্থীকে ফোনে সেটা জানিয়ে দিয়ে ওরা ঘুরতে চলে যায়।  

কোচিংয়ের স্যারেরা হঠাৎ পাতলুকে বিশেষ নজরে রাখা শুরু করলেন। পাতলুর খাতাটা সবার আগে চেক করা শুরু করলেন। সে কতো পেয়েছে, কেন খারাপ করলো, এসব নিয়ে আগে তাদের এতো মাথাব্যাথা ছিলো না। মোটু পাতলু বুঝতে পারলো, সবই পাতলুর পিতার কর্ম। পাতলুর অজান্তে বাবা কোচিংয়ে গিয়ে স্যারদের সঙ্গে তার ব্যাপারে কথা বলেন, খাতা দেখেন। এমনিতেই যথেষ্ট যন্ত্রণায় ছিলো, এখন আবার নতুন বিপদ শুরু হলো। মোটু পাতলু গ্যাংয়ের আরেক সদস্যকে কোচিংয়ে আনা নেয়ার জন্য একজন মহিলা নিয়োজিত আছেন। যতোক্ষণ কোচিং চলে, ততোক্ষন উনি বাইরেই বসে থাকতেন। একদিন ওই মহিলাকে পাতলুর বাবার একটা ছবি দেখিয়ে পাতলু বললো, ‘এই লোকটা আমাকে বেশ কিছুদিন ধরে ফলো করছে। এই লোকটাকে কোচিংয়ের আশেপাশে দেখলে জানাবেন, উনি কোচিংয়ে কার সঙ্গে কথা বলে, কী করে সব খেয়াল করবেন’। এরপর থেকে পাতলুর বাবা কখন কোচিংয়ে আসেন, কোন স্যারের সঙ্গে কথা বলেন, সব খবর পাতলুর কাছে চলে আসে। একদিন বাবাকে গিয়ে পাতলু বললো, ‘তুমি আজকে কোচিংয়ে গেছিলা?’ বাবা জিজ্ঞেস করে, ‘কে বললো?’ পাতলু বলল, ‘জানি, গেছো, সব খবর আমার কাছে চলে আসে।’ বাবাকে বুঝিয়ে দিলো যে, পাতলুর অজান্তে তার উপর নজরদারি করে সুবিধা করা যাবে না। এই করেই চলছিলো।

এসএসসি পরীক্ষার কয়েকমাস আগে তাদের মনে ভয় ধরে গেলো। রেজাল্ট নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই, কিন্তু তাদেরকে ঘিরে সবার এতো আশা। তারা তো সেসব আশা পূরণ করতে পারবে না। আর সবার এতো আশা পূরণ না হলে তাদের উপর কী ধরনের ঘুর্নিঝড় আছড়ে পড়বে, সেটা ভেবে দুজনেই পড়ায় মনযোগী হলো। 

পরীক্ষায় সময় পরীক্ষা দিলো দুজনে। পরীক্ষা কেমন হয়েছে জিজ্ঞেস করলে, তাদের উত্তর, 'পরীক্ষা তো সবসময়ই ভালো হয়, কিন্ত রেজাল্টটাই কেনো জানি খারাপ হয়ে যায়, আর সব ভালো হতে হবে এমন তো কথা নেই। যেকোন একটা ভালো হলেই হলো'। 
পরীক্ষা পর্ব শেষ, এবার রেজাল্ট। রেজাল্টের আগের দিন তারা ঠিক করলো, যদি ৪ পয়েন্ট পায় তবে বাসা থেকে পালাবে। মা-বাবার হাতে খুন হওয়ার কোনো মানে হয় না। প্ল্যান হলো, কক্সবাজার যাওয়ার। তারা সমুদ্রে ঘুরবে কিছুদিন। তারপর বাবা-মাকে ম্যাসেজ করে জানাবে, যদি রেজাল্টের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন না করে তাহলে বাসায় ফিরতে রাজি তারা। পরদিন সকাল ৯টায়, পাতলুর ফোন বেজে উঠলো। এক বন্ধু ফোন করে জানালো, সে বোর্ডে গিয়ে রেজাল্ট নিয়ে এসেছে, মোটু পাতলু দুজনেই জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। পাতলু তখন গভীর ঘুমে, ঘুমন্ত অবস্থাতেই মোটুকে জানালো, আপাতত কক্সবাজারের ট্রিপটা তাদের মিস।

 এদিকে বাসায় পাতলুর বাবা-মার ফোনে একের পর এক আত্মীয়স্বজনের কল। ‘পাতলু কি টেনশন করছে? ওকে বলেন টেনশন না করতে, এসময় এরকম লাগে সবার’। পাতলুর মা-বাবার উত্তর, ‘ও ঘুমাচ্ছে’। শুনে তো ওদের মাথা নষ্ট। পাতলু টেনশন করছে না কেন— এটা নিয়ে তাদের টেনশন শুরু হলো। সাড়ে দশটার দিকে ঘুম থেকে উঠে, পিসি অন করলো সে। পাতলুর বাবা তার একটা ছবি তুলে বললেন, ‘কোনো এসএসসি পরীক্ষার্থী রেজাল্টের দিন, দিনের বারোটা বাজে ঘুম থেকে উঠে, কম্পিউটার নিয়ে বসছে, এ ঘটনা তো সচরাচর ঘটে না, তাই ছবি তুলে রাখলাম’। বুঝলো বাসায় আর বেশিক্ষণ শান্তিতে থাকা যাবে না। মোটুকে ফোন করে বললো, ‘গোল্ডেন না হলে তো কপালে খাওয়া জুটবে না, চল কোথাও খেয়ে আসি।’ বাসায় জানিয়ে গেলো, স্কুলে যাচ্ছে।

ভালো একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে অনেককিছু অর্ডার দিলো। কিন্তু শান্তিমতো খাওয়ার উপায় নেই। স্কুলের টিচারদের ফোন। তারা জানালো, ‘যাচ্ছি স্কুলে’। খেয়ে, কিছুক্ষণ ঘুরে তারা স্কুলে গেলো তিনটার দিকে।
গিয়ে দেখে স্কুল ফাঁকা, সবাই রেজাল্ট জেনে চলে গেছে। এরপর তারা মোটুর মামার বাসার ছাদে গিয়ে উঠলো, সাথে কিছু চিপস-চকলেট-আইসক্রিম। গোল্ডেন কনফার্ম না হওয়া পর্যন্ত বাসায় যাওয়া উচিত হবে কিনা বুঝে উঠতে পারছে না তারা। বিকালের দিকে গোল্ডেনের রেজাল্ট নেটে পাওয়া যাবে, ফোনের নেট সর্বক্ষণ অন। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, মামার বাসার ছাদের তালা বন্ধ করে দিতে পারে তাই কতক্ষণ এদিক সেদিক হেঁটে, দুজনে মোটুর বাসার ছাদে গিয়ে বসলো। নেটে সার্চ দিতে দিতে হঠাৎ পাতলুর রেজাল্ট পেয়ে গেলো, ‘গোল্ডেন’ আর মোটুরটা সার্চ দিয়ে দেখলো, বাংলায় মিস। ঠিক সেই মূহুর্তে মাথায় আকাশ ভাঙলো দুজনের। তারা এতোদিন পর্যন্ত যা কিছু করেছে সব দুইজনে মিলে, একসঙ্গে করেছে। এই প্রথম দুইজনের ভিন্ন রেজাল্ট। মোটুর চেহারার দিকে তাকিয়ে পাতলু কি বলবে বুঝতে পারছে না। এদিকে পাতলুর বাবা-মা বাসায় নেটে রেজাল্ট দেখে ফোন করে বাসায় যেতে বললেন। পাতলু মোটুকে ছাদে রেখে বাসায় চলে গেলো। মোটু ওখানে কতক্ষণ স্থির বসেছিলো, পাতলুর জানা নেই। বাসায় ফিরে পাতলুর মাথার ভেতরটা কেমন যেন করছে! মোটুর বাংলায় মিস— এটা মেনে নিতে পারছে না। আর দুইজনই মিস করলে হয়তো এতক্ষণে তারা কক্সবাজার যাওয়ার টিকেট কাটতো। এরপর সাহস করে মোটুকে ফোন করতে পারলো না পাতলু। রাতে ফোন করলে, মোটু কিছু কড়া কথা শুনিয়ে ফোন কেটে দিলো। মোটু পাতলুর কাহিনী আর না টানি।


আমি জানি এই কাহিনী অনেকের বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যাবে। এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিল দুই দিন হলো। সব দিকে শুধু রেজাল্ট আর রেজাল্ট। কার ছেলে মেয়ে কেমন করলো, গোল্ডেন পেলো নাকি শুধু এ+ নাকি তাও পেলো না
এইসব নিয়ে আলোচনা চারদিকে। যাদের সন্তান ভাল করলো তারা সবাইকে গর্ব করে রেজাল্ট বলছে, আর যাদের সন্তান প্রত্যাশা অনুযায়ী রেজাল্ট করতে পারেনি, সেসব বাবা-মায়েরা মুখ লুকাচ্ছে আর সন্তানকে বোঝাচ্ছে, সে কতটা অযোগ্য! স্কুল লাইফের প্রিয় বন্ধুরা যারা একসঙ্গে খেলতো, একসঙ্গে আড্ডা দিতো তারা হঠাৎ একদিনে আলাদা হয়ে গেল। এক বন্ধু গোল্ডেন পেলো অন্য বন্ধু পেলো না। তাদের মধ্যে নিজেদের অজান্তেই এক ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে যায়। তাদের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তৈরি করে দেয় এই রেজাল্ট। এতোদিনের বন্ধুত্ব ধ্বংস করতে এই রেজাল্টই যথেষ্ট। সব পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলেই পত্রিকায় কিছু আত্মহত্যার খবরও বের হয়। এইবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে আত্মহত্যা করে ফেলেছে ইতিমধ্যেই। এইরকম আরও কিছু খবর এই কিছুদিন নিয়মিত পাবেন। প্রতিটা পরীক্ষার ফলাফল মানে অবধারিতভাবে কিছু বাচ্চা ছেলেমেয়ের মৃত্যু পারোয়ানা। আমাদের সবকিছু কেমন যেন সফলতা-কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। তুমি ভালো রেজাল্ট করেছো, ‘তুমি সফল’। তোমাকে সবাই মাথায় তুলে নাচবে। স্তুতিবাক্য ফুলঝুড়ি হয়ে ঝরে পড়বে। রেজাল্ট খারাপ কিংবা প্রত্যাশার তুলনায় খারাপ হলে সব শেষ। সমাজ, পরিবার, আত্মীয়, স্বজন কানে বারবার মনে করিয়ে দিতে থাকে, ‘তুমি অযোগ্য’। বাবা-মা হিসেব দিতে শুরু করেন এতোদিন তার পেছনে কতো টাকা খরচ হয়েছে। বাবা মায়েরা ছেলেমেয়ের সফল বন্ধুটিকে দেখিয়ে সন্তানকে বলে, ‘তুই কি করলি?’ এই কথাগুলা তাদের মানসিকভাবে কতোটা পীড়া দেয়, সেটা শুধু সেই সন্তানই জানে।
 এভাবেই সন্তানের মনে জন্ম নেয় প্রবল হীনমন্যতা, নিজের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণাবোধ। একটা মানুষ নিজেকে কতোটা ঘেন্না করলে, কতোটা অসহায় বোধ করলে আত্মহত্যা করে তা আমাদের ধারনারও বাইরে।
এ কেমন সমাজে আমরা বাস করি, কেমন শিক্ষা ব্যবস্থা; যেখানে জীবনের মূল্য শেখানো হয় না? যেখানে সফলতার কাছে মানুষ দাস হয়ে যায়।

 ঘুণেধরা শিক্ষাব্যবস্থায় রেজাল্ট হচ্ছে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টির মাধ্যেম মাত্র। আমি চাই এইসব ফালতু রেজাল্টের কারবার বন্ধ হোক। ভেদাভেদ দূর হোক। কিসের রেজাল্ট নিয়ে আমরা গর্ব করবো? আমাদের দেশে প্রতি বছর এতো এতো গোল্ডেনপ্রাপ্ত স্টুডেন্ট বের হচ্ছে, কি লাভ হচ্ছে আমাদের দেশের? তারা দেশের জন্য কি করছে? সবাই তো সেই টাকার পেছনে ছুটছে। সব যেন একেকটা গোল্ডেন রোবট তৈরি হচ্ছে।

সোমবার, ৯ মে, ২০১৬

বেশ্যা!

‘বেশ্যা’ শব্দটাকে আমরা সাধারণত গালি হিসেবে ব্যবহার করি। আমার ধারণা বেশ্যারা খুব সাহসী হয়। আমাদের সমাজে নারীকে দমিয়ে রাখার প্রধান অস্ত্রটি হল ‘চরিত্র’। পুরুষ নাকি চাইলে পারে, নারীর চরিত্র ‘নষ্ট’ করতে। সীমার বাইরে গেলেই নারীকে ‘সম্ভ্রম’ হারানোর ভয় দেখানো হয়। নারীর সম্ভ্রমটির অবস্থানটা ঠিক কোথায়? যোনির ভেতরে নাকি?

একমাত্র এই ভয়ের কাছে পরাজিত হয়েই নারী আজও বন্দী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কাছে। এই ভয়ই নারীকে বাধ্য করছে পুরুষের আধিপত্য মেনে নিতে।
ঘরে বাইরে সব জায়গায় যৌন সন্ত্রাসীরা ওঁত পেতে থাকে, নারীর চরিত্র নষ্ট(!) করতে। আর যৌনসন্ত্রাসীদের চরিত্র নষ্ট হয় কিসে শুনি?

বেশ্যাদের তো এসব ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। বেশ্যারা তথাকথিত ‘চরিত্র’ ‘সম্ভ্রম’ এর তোয়াক্কা করে না। তাই তারা অন্য যে কোন নারীর চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন ও সাহসী। বেশ্যাদেরকে পুরুষের সৃষ্ট চরিত্র রক্ষা করতে হয় না বলে, তারা তাদের জীবনে পুরুষের আধিপত্য মেনে নিতেও বাধ্য নয়।

আর নির্লজ্জ পুরুষজাতটার কথা আর কি বলব। দিনে যাদের বেশ্যা বলে থুতু ছিটায়, রাতে তাদের খদ্দের হয়ে থুতু চাটতে যায়। বেহায়া হলে কি আর এতটা বেহায়া হতে হয়!

পুরুষের প্রয়োজনেই নারী বেশ্যা হয়। কিন্তু বেশ্যা হওয়ার পর বেশ্যা নারীর কাছে ওসব চরিত্র-টরিত্র কোন পাত্তা পায় না। চরিত্রকে তোয়াক্কা না করার এই সাহসটাকেই পুরুষ ভয় পায়, ঘৃণা করে। ওই সাহসের অংশটুকু বাদ দিলে বেশ্যা ব্যাপারটা বেশ মজাদার হয়ে উঠে।

বেশ্যা মানে যদি বহুগামী নারী হয় বহুগামী পুরুষকে তবে কি বলা যায়? পুরুষ নারীকে মাতৃত্ব, সতীত্বের গুন শোনায়। অথচ সমাজের অধিকাংশ পুরুষই বহুগামী। পুরুষের বহুগামীতা আবার একটা বিশেষ গুণ। এটা নাকি পুরুষের সক্ষমতাকে বোঝায়! আর নারী বহুগামী হলেই নাকি বেশ্যা!

কিছুদিন আগে কিছু অনলাইন পত্রিকায় নিউজ দেখলাম, ঢাকায় নাকি ধনী ঘরের মেয়েরা বয়ফ্রেন্ড ভাড়া করছে। ধনী মেয়েরা ছেলেদের ভাড়া করছে নিজেদের যৌন চাহিদা মেটাতে। এই খবর কতটা সত্য জানি না। হয়তো সত্য, হয়তো মিথ্যা। এই খবরের শিরোনাম করা হয়েছে ‘কোথায় যাচ্ছে এই সমাজ’। আপনারা আমাকে বলুন তো, ‘কোথায় ছিলো এই সমাজ’? বেশ্যালয়গুলোর খদ্দের হয় কারা? কারা টিকিয়ে রাখছে পতিতাবৃত্তি? বেশ্যালয় বন্ধের কথা বললে, সমাজে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার অজুহাত দেখানো হয়, ইনিয়ে বিনিয়ে বেশ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। তখন কোথায় যায় এই সমাজ-প্রশ্ন তুলেছেন কি? তখন এই শিরোনাম দানকারীরাই বা কোথায় থাকে?

শেখ হাসিনা নাস্তিক হত্যার দায় নিবেন না বলাতে চারদিকে সমালোচিত হচ্ছেন। আমরা বলছি, তিনি হত্যাকারীদের উৎসাহিত করছেন। কেউ একবার ভেবে দেখছেন, যুগ যুগ ধরে পুরুষ নারীর উপর আধিপত্য বিস্তার করতে নারীকে অত্যাচার করেছে, ধর্ষন করেছে, এর দায় যে শুধুই পুরুষের, এটা আমরা কয়জন মানি? উল্টো পুরুষকেই বানিয়েছি নারীর রক্ষাকর্তা! পুরুষ নারীর রক্ষক হলে, ভক্ষকটা তবে কে?

আসলে রক্ষক-ভক্ষক সব একই সুত্রে গাঁথা। রক্ষক পুরুষ চায় না নারী স্বাধীন ভাবে চলুক, নিজের কথা নিজে বলুক, নিজের দায়িত্ব নিজে নিক। রক্ষক চায় নারী ভয় পাক, ভয়ে গুটিয়ে থাকুক, নিজেকে দূর্বল ভেবে তার কাছে ছুটে যাক নিরাপত্তার জন্য, তার আধিপত্য মেনে নিক। আর রক্ষকের এই চাওয়াগুলো বাস্তবে টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে ভক্ষক পুরুষ।

পুরুষতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই কেউ রক্ষক, কেউ বা ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। যেদিন নারীর আর রক্ষকের প্রয়োজন হবে না, সেদিন থেকে আর নারীকে পুরুষের আধিপত্য মেনে নিতে হবে না।

নারী জানুক যে, তার নিরাপত্তার জন্য কোন পুরুষের প্রয়োজন নেই। নারী নিজেই নিজের রক্ষক হয়ে উঠুক। নারী জানুক তার সম্ভ্রম তার যোনিতে নয়, নারীর সম্ভ্রম নারীর কর্মে, জ্ঞানে।