সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৬

আশায় হতাশায় প্রিয় শাহবাগ

২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবীতে অনলাইন একটিভিস্টরা এই আন্দোলন শুরু করেছিল, দেশের সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনকে সমর্থন করে রাস্তায় নেমেছিল। প্রথমে কেবল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার প্রতিবাদে কুখ্যাত এই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবী নিয়ে মাঠে নামলেও পরবর্তীতে সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি সহ একটি সুন্দর, প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন নিয়ে, দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অন্যায়, মুক্তচিন্তকদের হত্যায়ও গণজাগরণ মঞ্চ সরব থাকে, প্রতিবাদ জানায়।
২০১৩ সালে আমি ক্লাস নাইনের স্টুডেন্ট ছিলাম। শাহবাগের দাবীর সাথে আমি ও আমার বন্ধুরাও একমত ছিলাম। চিটাগাং চেরাগী পাহাড়ের মোড়ে ছিল চট্টগ্রাম গণজাগরণ মঞ্চ। কোচিং ক্লাসের ফাঁকে চলে যেতাম সেখানে, সবার সাথে স্লোগান দিতাম। সে এক অন্যরকম অনুভূতি।
ফেসবুকের কল্যাণে শাহবাগের আন্দোলনের সাথে আরও বেশি জড়িয়ে যাই। ব্লগ সম্পর্কে পরিচিত হয়ে, ছদ্ম নামে লিখা শুরু করি। দেখতাম, বাংলাদেশের তরুণদের এই আন্দোলনকে সমর্থন করে নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিনও তাঁর ফ্রি থট ব্লগে, কলামে, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখতেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সহ আরও নানা অনুষ্ঠানে তিনি শাহবাগ আন্দোলনের পক্ষে কথা বলে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে শাহবাগ আন্দোলনকে আরও পরিচিত করে তোলেন। আদর্শগত কারণে তসলিমা নাসরিন মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন না করলেও শাহবাগকে তিনি মৌলবাদ-ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে মুক্তচিন্তার একটি প্লাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করতেন। শাহবাগের তরুণদের হাতেই বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটবে, মৌলবাদের পতন ঘটবে, এটাই ছিল তাঁর বিশ্বাস।
কিন্তু হায়! সেই শাহবাগও মুক্তচিন্তার পক্ষে পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে লড়াই করে যাওয়া এই লেখকের মতকে সম্মান জানাতে কার্পণ্য করে।
বিভিন্ন সুত্র থেকে শোনা তথ্য অনুযায়ী জানতে পারি, শাহবাগে ২৬শে ফেব্রুয়ারি ‘আলো হাতে আঁধারের যাত্রী’ নামে একটি ডক্যুমেন্টারিটি প্রদর্শনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, কিন্ত শুনেছি গনজাগরণ মঞ্চের কেউ কেউ ওই ডক্যুমেন্টারিটি শাহবাগে প্রদর্শনে আপত্তি জানায়। কেবল তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য ওই ফিল্মে থাকায়, পুরো ফিল্মটি দেখানোর সিদ্ধান্তই বাতিল করে গণজাগরণ মঞ্চ।
৩৩ মিনিটের এই ভিডিওটিতে, নিহত লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বন্যা আহম্মেদ, ব্লগার ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা, ব্লগার আরিফুর রহমান, ব্লগার ওমর ফারুক লুক্স সহ আরও অনেকের বক্তব্য ছিলো। তাদের কাউকে নিয়েই গণজাগরণ মঞ্চের আপত্তি না থাকলেও কেবল তসলিমা নামটি থাকাতেই তারা ফিল্মটি না দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়। গণজাগরণ মঞ্চের এমন আচরণ আমাকে কতটা লজ্জিত আর হতাশ করেছে, তা আমি কয়েকটি শব্দ দিয়ে লিখে বুঝাতে পারব না।
হয়তো শাহবাগের নেতারা ভেবেছেন, শাহবাগে তসলিমা নাসরিন নামটি কোনভাবে উচ্চারিত হলে, মঞ্চের কিছু সমর্থক হারানোর সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু শাহবাগকে কেন সমর্থক হারানোর ভয় নিয়ে চলতে হবে? শাহবাগ তো একটি আদর্শের মঞ্চ, ভোটের রাজনীতি করা কোন আদর্শহীন রাজনৈতিক দল নয়। গণজাগরণ মঞ্চকে যদি সমর্থকের চিন্তা করে তার আদর্শ থেকে সরে আসতে হয় তবে গণজাগরণ মঞ্চ দেশের অন্য কোন মঞ্চ থেকে আলাদা হয় কি করে?
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানে ব্লগার ও অনলাইন একটিভিস্টরা যেসকল বিষয়ে লিখছেন, তার অধিকাংশই তসলিমা নাসরিন আশির দশকে তাঁর বইগুলোতে লিখে রেখেছেন। সেসময় তিনি একাই কলম ধরেছিলেন মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে।
আজকে যদি রাজনৈতিক দলগুলো তসলিমা নাসরিনকে সমর্থন করতো, তবে নিশ্চয়ই গণজাগরণ মঞ্চ 'তসলিমা নাসরিন' নামটি গর্বের সাথে উচ্চারণ করতো। কিন্তু যেহেতু তসলিমা নাসরিনের কোন রাজনৈতিক দল নেই, মৌলবাদী নারীবিরোধীদের বিপক্ষে একাই লড়াই করছেন, তাই মূর্খদের সাথে তাল মিলিয়ে শাহবাগেও ‘তসলিমা’ নামটি নিষিদ্ধ একটি নাম হিসেবেই রয়ে গেলো।
বাংলাদেশের সব পত্রিকা যখন তসলিমা নাসরিনের লেখা ছাপাতে ভয় পেতো, সেই অবস্থায় প্রথম ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ তসলিমা নাসরিনের লেখা ছাপানোর সাহস করে। শুরুতে অনেক হুমকি, গালাগাল পেলেও, এখন অনেকেই লেখকের মতকে সমর্থন করে, লেখকের লেখার প্রশংসা করে চিঠি লেখে।
সাহস নিয়ে শুরুটা করতে পারলেই পরিস্থিতি পাল্টে দেয়া সম্ভব। সেই সাহসটুকু কি তবে আমার প্রিয় মঞ্চটির নেই?
দেশে একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোতে খুব হতাশ হই। মাঝেমাঝে ভাবি, দেশ নিয়ে আমার এত ভাবনা কেন? এতে আদৌ কি কোন লাভ আছে? দেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখার, আশা ভরসার একটিই জায়গা ছিল, তরুণ প্রজন্মের সৃষ্টি, ‘শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর’। এই ভরসার জায়গাটিও কি তবে শেষ পর্যন্ত রইল না?

1 টি মন্তব্য:

  1. সব কিছু এমন হয়,চলার পথে অনেক কিছু কে মানুষ ভুলে যায় শুধু নিজের কথা চিন্তা কেরে,আর শাহাবাগে এক সময় আমিও নিয়মিত গিয়েছিলাম কিন্তু কিছু কারনে আর যাওয়া হয় নাই,,তখন হঠাৎ করেই পলিটিক্স এর নেতাদের আদিপ্তত চলতে থাকে...

    উত্তরমুছুন