সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৬

আশায় হতাশায় প্রিয় শাহবাগ

২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবীতে অনলাইন একটিভিস্টরা এই আন্দোলন শুরু করেছিল, দেশের সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনকে সমর্থন করে রাস্তায় নেমেছিল। প্রথমে কেবল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার প্রতিবাদে কুখ্যাত এই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবী নিয়ে মাঠে নামলেও পরবর্তীতে সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি সহ একটি সুন্দর, প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন নিয়ে, দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অন্যায়, মুক্তচিন্তকদের হত্যায়ও গণজাগরণ মঞ্চ সরব থাকে, প্রতিবাদ জানায়।
২০১৩ সালে আমি ক্লাস নাইনের স্টুডেন্ট ছিলাম। শাহবাগের দাবীর সাথে আমি ও আমার বন্ধুরাও একমত ছিলাম। চিটাগাং চেরাগী পাহাড়ের মোড়ে ছিল চট্টগ্রাম গণজাগরণ মঞ্চ। কোচিং ক্লাসের ফাঁকে চলে যেতাম সেখানে, সবার সাথে স্লোগান দিতাম। সে এক অন্যরকম অনুভূতি।
ফেসবুকের কল্যাণে শাহবাগের আন্দোলনের সাথে আরও বেশি জড়িয়ে যাই। ব্লগ সম্পর্কে পরিচিত হয়ে, ছদ্ম নামে লিখা শুরু করি। দেখতাম, বাংলাদেশের তরুণদের এই আন্দোলনকে সমর্থন করে নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিনও তাঁর ফ্রি থট ব্লগে, কলামে, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখতেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সহ আরও নানা অনুষ্ঠানে তিনি শাহবাগ আন্দোলনের পক্ষে কথা বলে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে শাহবাগ আন্দোলনকে আরও পরিচিত করে তোলেন। আদর্শগত কারণে তসলিমা নাসরিন মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন না করলেও শাহবাগকে তিনি মৌলবাদ-ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে মুক্তচিন্তার একটি প্লাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করতেন। শাহবাগের তরুণদের হাতেই বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটবে, মৌলবাদের পতন ঘটবে, এটাই ছিল তাঁর বিশ্বাস।
কিন্তু হায়! সেই শাহবাগও মুক্তচিন্তার পক্ষে পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে লড়াই করে যাওয়া এই লেখকের মতকে সম্মান জানাতে কার্পণ্য করে।
বিভিন্ন সুত্র থেকে শোনা তথ্য অনুযায়ী জানতে পারি, শাহবাগে ২৬শে ফেব্রুয়ারি ‘আলো হাতে আঁধারের যাত্রী’ নামে একটি ডক্যুমেন্টারিটি প্রদর্শনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, কিন্ত শুনেছি গনজাগরণ মঞ্চের কেউ কেউ ওই ডক্যুমেন্টারিটি শাহবাগে প্রদর্শনে আপত্তি জানায়। কেবল তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য ওই ফিল্মে থাকায়, পুরো ফিল্মটি দেখানোর সিদ্ধান্তই বাতিল করে গণজাগরণ মঞ্চ।
৩৩ মিনিটের এই ভিডিওটিতে, নিহত লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বন্যা আহম্মেদ, ব্লগার ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা, ব্লগার আরিফুর রহমান, ব্লগার ওমর ফারুক লুক্স সহ আরও অনেকের বক্তব্য ছিলো। তাদের কাউকে নিয়েই গণজাগরণ মঞ্চের আপত্তি না থাকলেও কেবল তসলিমা নামটি থাকাতেই তারা ফিল্মটি না দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়। গণজাগরণ মঞ্চের এমন আচরণ আমাকে কতটা লজ্জিত আর হতাশ করেছে, তা আমি কয়েকটি শব্দ দিয়ে লিখে বুঝাতে পারব না।
হয়তো শাহবাগের নেতারা ভেবেছেন, শাহবাগে তসলিমা নাসরিন নামটি কোনভাবে উচ্চারিত হলে, মঞ্চের কিছু সমর্থক হারানোর সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু শাহবাগকে কেন সমর্থক হারানোর ভয় নিয়ে চলতে হবে? শাহবাগ তো একটি আদর্শের মঞ্চ, ভোটের রাজনীতি করা কোন আদর্শহীন রাজনৈতিক দল নয়। গণজাগরণ মঞ্চকে যদি সমর্থকের চিন্তা করে তার আদর্শ থেকে সরে আসতে হয় তবে গণজাগরণ মঞ্চ দেশের অন্য কোন মঞ্চ থেকে আলাদা হয় কি করে?
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানে ব্লগার ও অনলাইন একটিভিস্টরা যেসকল বিষয়ে লিখছেন, তার অধিকাংশই তসলিমা নাসরিন আশির দশকে তাঁর বইগুলোতে লিখে রেখেছেন। সেসময় তিনি একাই কলম ধরেছিলেন মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে।
আজকে যদি রাজনৈতিক দলগুলো তসলিমা নাসরিনকে সমর্থন করতো, তবে নিশ্চয়ই গণজাগরণ মঞ্চ 'তসলিমা নাসরিন' নামটি গর্বের সাথে উচ্চারণ করতো। কিন্তু যেহেতু তসলিমা নাসরিনের কোন রাজনৈতিক দল নেই, মৌলবাদী নারীবিরোধীদের বিপক্ষে একাই লড়াই করছেন, তাই মূর্খদের সাথে তাল মিলিয়ে শাহবাগেও ‘তসলিমা’ নামটি নিষিদ্ধ একটি নাম হিসেবেই রয়ে গেলো।
বাংলাদেশের সব পত্রিকা যখন তসলিমা নাসরিনের লেখা ছাপাতে ভয় পেতো, সেই অবস্থায় প্রথম ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ তসলিমা নাসরিনের লেখা ছাপানোর সাহস করে। শুরুতে অনেক হুমকি, গালাগাল পেলেও, এখন অনেকেই লেখকের মতকে সমর্থন করে, লেখকের লেখার প্রশংসা করে চিঠি লেখে।
সাহস নিয়ে শুরুটা করতে পারলেই পরিস্থিতি পাল্টে দেয়া সম্ভব। সেই সাহসটুকু কি তবে আমার প্রিয় মঞ্চটির নেই?
দেশে একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোতে খুব হতাশ হই। মাঝেমাঝে ভাবি, দেশ নিয়ে আমার এত ভাবনা কেন? এতে আদৌ কি কোন লাভ আছে? দেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখার, আশা ভরসার একটিই জায়গা ছিল, তরুণ প্রজন্মের সৃষ্টি, ‘শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর’। এই ভরসার জায়গাটিও কি তবে শেষ পর্যন্ত রইল না?

ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা

১.
কিছুদিন আগে চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, ‘নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি হবে ইসলাম’। মন্ত্রী তার বক্তব্যে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন, তারা বিএনপি জামায়েতের চেয়েও বেশি ধার্মিক। তাদের সরকার মাদ্রাসা (মগজ ধোলায় কারখানা) বানাচ্ছে, মসজিদ তৈরি করছে। কে কার চেয়ে বেশি ধার্মিক সেটা প্রমাণ করতে ব্যস্ত। ভোটের জন্য আওয়ামীলীগ বিএনপি জামায়েতের সাথে ধার্মিক হওয়ার প্রতিযোগীতায় নেমেছে।
বাংলাদেশে ক্লাস ১-১০ পর্যন্ত ধর্ম নামে একটা আবশ্যিক সাবজেক্ট আছে। আগে ধর্ম বই গুলোর নাম ইসলাম ধর্ম, সনাতন ধর্ম থাকলেও কয়েক বছর আগে বই গুলোর নামে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। নাম হয়েছে, ইসলাম ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, সনাতন ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা। সব ধর্মের নামের শেষে নৈতিক শিক্ষা যোগ করা হয়েছে।
‘নৈতিক’ শব্দের অর্থটা নিয়ে আমি কিছুটা বিভ্রান্ত ছিলাম। ডিকশেনারী ঘেঁটে পেলাম, বিশেষ্য 'নীতি'> বিশেষণ 'নৈতিক'> বিশেষ্য 'নৈতিকতা'। নীতি শব্দটি ন্যায়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
প্রশ্ন হল কোনও ধর্ম কি কখনো নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি হতে পারে? অবশ্যই না।
সদা সত্য কথা বললে আল্লাহ্‌ খুশি হবেন, নাস্তিক হত্যা করলেও আল্লাহ্‌ খুশি হবেন। কাজেই সত্য বলাটা নৈতিক হলেও নাস্তিক হত্যা মোটেই নৈতিক কাজ নয়। সুতরাং ধর্মের সাথে নৈতিকতা মিলিয়ে ফেলাটা ঠিক নয়।
ধর্ম মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে, যুদ্ধ-সংঘর্ষের কারণ হতে পারে, বোমা মেরে মানুষ মারার কারণ হতে পারে, চাপাতি দিয়ে নাস্তিক হত্যার শিক্ষা দিতে পারে। কিন্তু নৈতিক শিক্ষা কখনোই দিতে পারে না। নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

২.
আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, আমার খুব প্রিয় একজন বন্ধু ছিল, আমাদের বাসা পাশাপাশি, একসাথে আমরা আর্ট ক্লাসে যেতাম। একদিন আর্ট ক্লাস থেকে ফেরার পথে দেখলাম পাশেই একটা খালি জায়গায় পূজার মণ্ডপের মত বানানো হয়েছে। সেদিন কি যেন একটা পূজা ছিল।
আমি ওই বন্ধুকে বললাম, ‘চল গিয়ে দেখে আসি।’
সে বলল, ‘না, আমি যাবো না’।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’
বলল, ‘আমাদের ধর্মে মূর্তি পূজা হারাম’।
বন্ধু যখন যাচ্ছে না, আমিও আর গেলাম না। কারণ আমি মূর্তি বিশ্বাস করে মূর্তিটা দেখতে চাই নি, ব্যাপারটা কি হচ্ছে, সেটাই দেখতে চেয়েছিলাম।
একদিন আর্ট ক্লাসে স্যার কিছু একটা আঁকতে দিয়েছিলেন, যেখানে কিছু মানুষের ছবি আঁকাতে হবে। আমার বন্ধুটি, রঙে তুলি ডুবিয়ে আঁকতে আঁকতে বলল, জানিস আমাদের কিন্তু মানুষ আঁকা মানা। বললাম, স্যার তো আঁকতে দিলো।
-‘স্যার হিন্দু তাই দিয়েছে।’
‘তাহলে তুই আঁকছিস যে?’
-‘ থাক, আঁকতে ভাল লাগছে, শিশুদের গুণা আল্লাহ্‌ মাফ করে দেয়।’
মাঝেমাঝেই তার সাথে কথা বলার সময় এমন কিছু কথা বলতো যেসবে তাকে আমার খুব অচেনা লাগতো, অপমান বোধ করতাম তার কথা শুনে। ‘তোরা তো হিন্দু, তোরা এটা করিস, সেটা করিস, আমরা ওইসব করি না, গুণা। আমাদের এই নিয়ম, তোদের ওই নিয়ম।’ নিজেকে হিন্দু ভেবে অপমানবোধ করতাম তা নয়, বন্ধু আমাকে হেয় করে দেখছে চিন্তা করেই খারাপ লাগতো। আমাদের মাঝে বন্ধুত্ব টিকে ছিল নিজেদের গুণে। আর আমাদের মধ্যে যা কিছু পার্থক্য, যা কিছু সমস্যা, সেসব হয়েছিল ধর্মের কারণে।
ছোটবেলায় বন্ধুরা হিন্দুদের নিয়ে, হিন্দু ধর্ম নিয়ে আমাকে কিছু বললে আমি বুঝে পেতাম না কেন আমাকে হিন্দু ধর্মের ত্রুটি দেখাচ্ছে ওরা। ওদের কথাবার্তায় মনে হতো হিন্দু ধর্মের ভুল মানে আমার ভুল। বড় হয়ে বন্ধুদের মধ্যে কেউ হিন্দু ধর্মের ভুল ত্রুটি নিয়ে কথা বললে, আমি আরও কিছু যৌক্তিক ভুল ধরিয়ে দিতাম, যেটা আবার তাদের পছন্দ হতো না। কারণ তারা মূলত আমাকে উদ্দেশ্য করেই, আমাকে অপমান করতেই সেসব কথা বলতো। যেহেতু আমি একজন অবিশ্বাসী, কাজেই আমার এতে কিচ্ছু যায় আসে না। কিন্ত আমি যখনই হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি অন্য ধর্ম নিয়ে কিছু বলতে শুরু করতাম তখনই তাদের চেহারা পাল্টে যেতো। একটু আগে তারা হিন্দুদের অযৌক্তিক বিশ্বাস নিয়ে হাসাহাসি করলেও নিজেদের অযৌক্তিক হাস্যকর বিশ্বাসগুলোকে তারা খুব যত্নে লালন করে। তারা অন্যের বিশ্বাস নিয়ে হাসতে পারলেও, তাদের বিশ্বাস নিয়ে কেউ হাসতে পারবে না, এমনই নিয়ম!
স্কুল কলেজে মুসলমান ক্লাসমেটরা তাদের হিন্দু ক্লাসেমেটটিকে ধর্ম প্রসঙ্গ তুলে অপমান করতে পছন্দ করে। আমি অবিশ্বাসী বলে হয়তো এতে আমি অপমানিত হতাম না, কিন্তু অন্য হিন্দুরা কোন উত্তর দিতে পারতো না, নিজের ক্লাসমেটদের কাছে অপমানিত হতো, চুপচাপ সহ্য করতো। বাংলাদেশের একটি রাষ্ট্র ধর্ম আছে, একটি নির্দিষ্ট ধর্মের অনুভূতির প্রতি রাষ্ট্র খুবই যত্নবান। সেখানে অন্যদের চুপ না থেকে উপায় আছে!

৩.
একদিন একজন বলল, ‘তোরা হিন্দুদের তো এক পা ইন্ডিয়ায়, বাংলাদেশে থেকে ইন্ডিয়াকে সাপোর্ট করিস’ এক পা ইন্ডিয়ায় থাকার যথেষ্ট কারণ আছে। কিছুদিন আগে স্লোভাকিয়ায় একজন ইন্ডিয়ান মুসলিম টুরিস্টের সাথে কথা হচ্ছিল। ইন্ডিয়ায় তাদের বাড়ি হিন্দু এলাকায়। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন সমস্যা হয় কিনা। বলল, না, কোন সমস্যা করে না হিন্দুরা। করলে সাথেসাথেই জবাব দিয়ে দেয়া হয়। আর বাংলাদেশে যেকোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে হিন্দু বাড়ি, মন্দির পোড়ানো এখন ডাল-ভাত টাইপ। আর হিন্দু মেয়েরা একটু বড় হলেই বাবা-মায়েরা মেয়েকে মুসলমান ছেলেদের হাত থেকে রক্ষা করতে ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে দেয়, যাদের সামর্থ আছে। এরকম অবস্থায় হিন্দুদের এক পা ইন্ডিয়ায় থাকাটাই স্বাভাবিক। একটি অনলাইন পত্রিকা নিউজে পড়লাম, সেদিন ধর্মশালায় বাংলাদেশ বনাম ন্যাদারল্যান্ডসের খেলায় গ্যালারির এক কর্নারে বসে চোখ মুছছেন এক যুবক! বাংলাদেশের তামিম যখন চার-ছক্কার তুবড়ি ফুটাচ্ছিলেন তখন আনন্দে লাফিয়ে ওঠে যুবক চোখ মোছেন! আবার যখন বাংলাদেশের একের পর এক উইকেটের পতন ঘটছে তখনো তাকে চোখ মুছতে দেখা যায়। এই যুবকের নাম বিক্রম। জন্মেছিলেন বরিশালের উজিরপুরের গ্রামে। তার তিন বছর বয়সে তার পরিবারটি বাংলাদেশ ছেড়ে গিয়ে কলকাতাবাসী হয়।
খুশিতে মাকে জানালো যে সে বাংলাদেশের খেলা দেখছে। মা ছেলের কাছে জানতে চাইলেন, বরিশালের কেউ স্টেডিয়ামে আছে কিনা। এত বছর ইন্ডিয়ায় থেকেও নিজের দেশ বলতে তারা বাংলাদেশকেই বুঝে। ইন্ডিয়ায় এক পা থাকুক কিংবা দুই পা, মন কিন্তু থাকে বাংলাদেশেই।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মুসলমানি

১.
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মুসলমানি কার্যক্রম তো সম্পন্ন হল। মুসলমানি উপলক্ষ্যে ব্লগার বলিও হল। বাকি থাকে শরিয়া আইন কায়েম করা, ৯০% মুসলমানের দেশকে ১০০% মুসলমানের দেশে রূপান্তর করা। ১০% এখন হয় আগা কেটে কনভার্ট হও নতুবা বর্ডার ক্রস করো, তবে গনিমতের মালগুলোকে কোথাও যেতে দেয়া যাবে না। তাদেরকে রেখে দেয়া হবে ইমানদণ্ডের সেবা করার জন্য।
মুসলমানির পর সরকারের মন্ত্রীরা নাকি বলেছেন, দেশের কোথাও সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলে সরকার ঘরে বসে থাকবে না। হ্যাঁ, সরকার ঘরে বসে থাকবে না, সরকারও সংখ্যালঘুদের অত্যাচার নির্যাতন করতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে। এমন সুন্নতী কাজ ফেলে কেউ ঘরে বসে থাকতে পারে?
সামনে পহেলা বৈশাখ। দেশের মুসলমানি যখন হয়ে গেলো ‘পহেলা বৈশাখকে না বলুন’ কর্মসূচীও শুরু করা উচিত। ফেসবুকে এ জাতীয় একটা ইভেন্টও দেখলাম। যদিও মডারেটরা এর ঘোর বিরোধিতা করছেন। এইসব ইভেন্ট নাকি ইসলাম সম্পর্কে মানুষকে ভুল ধারণা দিচ্ছে। মডারেটদের মতে, শফি হুজুররা ইসলামের অপব্যাখা দিচ্ছে, আইসিস-বোকো হারাম-আল কায়দা-হামাস জাতীয় ইসলামী জঙ্গি সংগঠন গুলো ইসলাম সম্পর্কে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। সবাই তো দেখছি ইসলামের অপব্যাখা দিচ্ছে, ইসলাম সম্পর্কে ভুল তথ্য তুলে ধরছে। সঠিকটা তবে কারা তুলে ধরছে? সঠিকটা আসলে কী?

২.
রাষ্ট্র ধর্ম নিয়ে যা কিছু কথাবার্তা প্রতিবাদ তার সবকিছুই হচ্ছে অনলাইনে। অনলাইনের নাস্তিক ব্লগাররা ছাড়া এ নিয়ে কেউ কোন শব্দ করছেন না। এটা আমাকে খুব অবাক করেছে। কয়েকজন সেলেব্রেটি মডারেটের আইডি পেইজ ঘেঁটে দেখলাম তাদের সব কথা তনু হত্যা, তনু ধর্ষণ নিয়ে। রাষ্ট্র ধর্ম নিয় একটি বাক্যও নেই। তনু ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় নি বলেছে এ নিয়ে তারা ক্ষুব্ধ। রাষ্ট্র ধর্ম যেহেতু ইসলাম। আর ইসলামের আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের প্রমাণ হিসেবে চারজন পুরুষ সাক্ষী অথবা ৮ জন নারী সাক্ষী (যেহেতু ইসলামে ১জন পুরুষ=২জন নারী) জোগাড় না করতে পারলে অভিযোগকারীর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। কাজেই তনু ধর্ষণের যেহেতু কোন সাক্ষী পাওয়া যায় নি কাজেই তনুর ধর্ষণ হয় নি। এটা তারা মেনে নিতে চাইছে না কেন?

৩.
‘ধর্মের দোহায় দিয়ে নারীকে দমিয়ে রাখা যাবে না’ এই জোকসটি নাকি নারী দিবসে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার এক বক্তব্যে বলেছেন। জোকস বলছি এই কারনেই, কারণ শরিয়া আইনে নারীর ঘর থেকে বের হওয়াই নিষেধ।
স্বামী তার স্ত্রীকে পবিত্র আইন শিক্ষার জন্য গৃহের বাইরে যাবার অনুমতি দিতে পারবে। সেটা এই কারণে যে যাতে করে স্ত্রী জিকির করতে পারে এবং আল্লাহ্‌র বন্দনা করতে পারে। এই সব ধর্মীয় শিক্ষা লাভের জন্য স্ত্রী প্রয়োজনে তার বান্ধবীর গৃহে অথবা শহরের অন্য স্থানে যেতে পারে। এ ছাড়া স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী কোন ক্রমেই তার মাহরাম (যে পুরুষের সাথে তার বিবাহ সম্ভব নয়, যেমন পিতা, ভ্রাতা, ছেলে…ইত্যাদি) ছাড়া গৃহের বাইরে পা রাখতে পারবে না। শুধু ব্যতিক্রম হবে হজ্জের ক্ষেত্রে, যেখানে এই ভ্রমণ বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া অন্য কোন প্রকার ভ্রমণ স্ত্রীর জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং স্বামীও অনুমতি দিতে পারবে না। --শরিয়া আইন, এম ১০.৩
স্বামীর কর্তব্য হবে স্ত্রীকে গৃহের বাইরে পা না দেবার আদেশ দেওয়া। --শরিয়া আইন, এম ১০.৪
আর নারী নেতৃত্ব তো হারাম আছেই। এখন মডারেটরা সব এসে বলবে, কোথায় ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম বলা হয়েছে? দেখান, ইসলামের অপব্যাখা দিবেন না। এই নিন রেফারেন্স-
সহীহ বুখারী (তাওহীদ) অধ্যায়ঃ ৯২/ ফিতনা, হাদিস নাম্বার:৭০৯৯--আবূ বকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একটি কথা দিয়ে আল্লাহ্ জঙ্গে জামাল (উষ্ট্রের যুদ্ধ) এর সময় আমাকে বড়ই উপকৃত করেছেন। (তা হল) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যখন এ খবর পৌঁছল যে, পারস্যের লোকেরা কিসরার মেয়েকে তাদের শাসক নিযুক্ত করেছে, তখন তিনি বললেনঃ সে জাতি কক্ষনো সফলকাম হবে না, যারা তাদের শাসনভার কোন স্ত্রীলোকের হাতে অর্পণ করে। (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬০৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬১৮)

৪.
কলেজে এক ক্লাসমেট ছিল, কথায় কথায় কোরান হাদিস নিয়ে আসতো। মাদ্রাসা থেকে এসএসসি পাশ করেছে। সে একবার আমাকে বুঝাচ্ছিল, নাস্তিকতা কতটা খারাপ।
‘কোরানে কি নাই? সবকিছুই আছে, তারপরও কেন নাস্তিকরা কোরান মানে না? আল্লাহ্‌ মানে না?’
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কলেজের সব ছেলেদের সাথে তোর যোগাযোগ। তোর এই পোলা নাচানি স্বভাবের ব্যাপারে কোরানে কিছু নাই?
সে তখন বলল, ‘আমরা গুনাহগার বান্দা। গুনাহ করি, আমাদেরও শাস্তি হবে।’
বললাম, ‘তাহলে আমাদের শাস্তির ব্যাপারটাও আল্লাহর হাতে ছেড়ে দে প্লিজ’
নাস্তিকদের শাস্তির ব্যাপারটা মুমিনরা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিচ্ছে না কেন? কারণ আল্লাহ্‌ নিজে নাস্তিকদের কঠোর শাস্তি দিবেন পরকালে। তবে ইহকালে তাদের জন্য কিছু শাস্তির দায়িত্ব তিনি প্রকৃত মুসলমানদের উপর দিয়ে গেছেন। জানি মডারেটগণ মানবেন না। তাই রেফারেন্স হাজির--
আর তাদেরকে হত্যা কর যেখানে পাও সেখানেই। (কোরান ২:১৯১)
খুব শীঘ্রই আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করবো। (কোরান ৩:১৫১)
যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হল তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি। (কোরান ৫:৩৩)
যুদ্ধ কর ওদের সাথে, আল্লাহ তোমাদের হস্তে তাদের শাস্তি দেবেন। তাদের লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের জয়ী করবেন এবং মুসলমানদের অন্তরসমূহ শান্ত করবেন। (কোরান ৯:১৪)
তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবের ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম। (কোরান ৯:২৯)
হে নবী, কাফেরদের সাথে যুদ্ধ (ইংরেজি অনুবাদে - strive hard) করুন এবং মুনাফেকদের সাথে তাদের সাথে কঠোরতা অবলম্বন করুন। (কোরান ৯:৭৩)
হে ঈমানদারগণ, তোমাদের নিকটবর্তী কাফেরদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাও এবং তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করুক আর জেনে রাখ, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন। (কোরান ৯:১২৩)
আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেব। কাজেই গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে কাট জোড়ায় জোড়ায়। (কোরান ৮:১২)

৫.
নাজিমুদ্দিন সামাদ হত্যার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, নাজিমুদ্দিন সামাদ ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর লেখালেখি করতেন কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরও বলেছেন, এভাবে মানুষের ধর্মে আঘাত দেওয়া, বিশ্বাসে আঘাত দেওয়া, পৃথিবীর কোনও দেশেই তা গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যান্য ব্লগার হত্যার পর সাধারণত মন্ত্রীরা বলতেন, তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হবে। যদিও এর কোনকিছুই বাস্তবে ঘটতো না। তবে রাষ্ট্রের মুসলমানি হওয়ার পর মন্ত্রীর কথাও পাল্টে গেলো। মন্ত্রীর কথা অনুযায়ী, নাজিমুদ্দিন কি লিখেছে সেটার উপর নির্ভর করবে তাকে হত্যা করা ঠিক হয়েছে নাকি ভুল।
ব্লগার হত্যা ব্যাপারটা এতদিন থেমে থাকলেও এতদিন পর ঠিক এই সময়েই ব্লগার হত্যার কারণটা কি হতে পারে? রাষ্ট্র ধর্ম, তনু হত্যা, রিজার্ভের টাকা লুট এইসব ইস্যু নিয়ে যখন অনলাইনে ব্লগাররা প্রতিবাদ করছে, এই মুহূর্তে ব্লগারদের লেখার বিষয় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে আরেকজন ব্লগার হত্যা একটি চমৎকার বুদ্ধি নয় কি?
আমারও আগে ভাবতে ভালো লাগতো যে, ব্লগার হত্যাগুলো করছে জামায়েত শিবির। সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে জামায়েত শিবির দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। কিন্তু একের পর এক এতগুলো হত্যার পর কোনরকম পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। বিচারের নাম নেই, ব্লগাররা কি লিখল সেসব খতিয়ে দেখতে ব্যস্ত। এ থেকে বোঝা যায় প্ল্যান শুধুমাত্র জামায়েত শিবিরের নয়। ব্লগার হত্যাগুলো কোনটাই প্রশাসনের অজান্তে ঘটেনি।
ব্লগার-প্রকাশক হত্যাই বুঝিয়ে দিচ্ছে মূর্খরা কলমকে কতটা ভয় পায়। এত কিছুর পরও তাদের অন্ধ বিশ্বাসে আমরা প্রতিনিয়ত আঘাত দিয়ে যাচ্ছি। তাদের বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করছি। মৃত্যু জেনেও করছি। এর কোন তুলনা হয় না।

মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারি, ২০১৬

বুক!

আমি স্লোভাকিয়ায় একজন বাঙালি মহিলার সাথে থাকি। এই ৪মাসের মধ্যে তার সাথে আমার যথেষ্ট ভাব হয়েছে। তিনি এখন আমার সবকিছুর সঙ্গী। কথায় কথায় তিনি জানতে পারলেন যে আমি কখনও ব্রা পরিনি। শুনে খুব অবাক হলেন।তিনি আমার বুকের সাইজ নিয়ে খুব চিন্তিত। তার মতে, আঠারো বছরের মেয়ের বুকের গঠন যেমন হওয়া উচিত, আমার বুকের গঠন ঠিক সেরকম নয়। আমাকে গায়োনকলিজিস্ট দেখানোর চিন্তাও করছিলেন তিনি।

সেদিন হটাত আমাকে ডেকে, একটা লাল রঙের ব্রা দেখিয়ে বললেন, এটি তার অনেক আগের ব্রা, সবচেয়ে ছোট সাইজের ব্রা বলতে যা বুঝায়, এটি তাই। একবার মাত্র পরেছেন, তিনি ওই ব্রা আমাকে উপহার দিতে চান। তিনি আমার ব্রার ‘হাতেখড়ি’ করাতে চান। বললাম, এটা ‘হাতেখড়ি’ হবে না, ‘বুকে-খড়ি’ হবে। আমি তার উপহার গ্রহণ করলাম বটে, তবে আমি জিজ্ঞেস  করলাম ব্রা কেন পরা জরুরি? উনি বললেন, গুগল করে যেন জেনে নিই। 

ব্রা যেহেতু আমি পরি নি, কাজেই এই বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই বললেই চলে। তাই আমার আজকের লেখার বিষয় ব্রা নয়, বুক। বাংলাদেশে, মায়েরা সবসময় খেয়াল রাখে মেয়ের ওড়না ঠিক জায়গায় আছে কিনা। রাস্তায় চলাফেরার সময় লোকেরাও মেয়েদের বুকের ওড়নাটা ঠিক ওই জায়গাটাতে আছে কিনা দেখে নেয়, তারপর কোন একটা বাজে মন্তব্য করে নিজের পুরুষত্বের প্রমাণ দেয়। ঠিক এই কারণেই মেয়েরা সবসময় নিজের বুক নিয়ে চিন্তিত থাকে। কেউ দেখে ফেলল কিনা, কেউ যেন আবার বাজে মন্তব্য না করে। বুকের সাইজ বড় হতে থাকলে সেটা নিয়ে তারা খুব বিরক্ত হয়। কারণ এজন্য হয়তো তাকে ওড়নার উপর আরও কিছু পরতে হতে পারে, বুক ঢাকার জন্য।

আমাদের কলেজে আমরা ছেলেমেয়ে একসাথে লেখাপড়া করতাম। কলেজের মাঠটাতে ছেলেরা সবসময়ই কিছু না কিছু খেলতও।কখনও কলেজের কোন মেয়েকে ওই মাঠে খেলতে দেখি নি। একবার আমার মেয়ে বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে মজা করতে করতে দৌড়চ্ছিল, দৌড়ানোর সময় ক্রস বেল্ট বাতাসে উল্টেপাল্টে গিয়েছিল, সেসব দেখে ছেলেদের হাসির শেষ নেই। এরপর থেকে ওই মেয়ে বন্ধুদের দৌড়ানোটুকুও বন্ধ হয়ে গেলও। কেউ দৌড়লে খুব সাবধানে, যেন ওড়নার কিছু না হয়, জামা যেন বাতাসে না উড়ে। অথচ ছেলেরা কলেজের ফুল প্যান্ট খুলে থ্রি কোয়াটার, আর শার্ট খুলে সেন্ডও গেঞ্জি পরে দিব্যি খেলছে। খেলার সময় কারও কারও প্যান্ট নিচে নামতে নামতে শেষ পর্যায়ে এসে গেলেও সেদিকে তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। না থাকাটাই স্বাভাবিক। খেলার সময় এসব নিয়ে ভাবলে চলে নাকি! কিন্তু মেয়েদের এসব নিয়ে ভাবতে হবে।

একদিন কলেজে গিয়ে জানতে পারলাম, আমাদের কলেজে নাকি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হবে। আমার মেয়ে বন্ধুরা বলল, ‘ইতু তোর তো ক্রিকেট পছন্দ, তুই টুর্নামেন্টে নাম দিস’। জিজ্ঞেস করলাম, ‘শুধু আমি কেন? তোরা দিবি না?’ বলল, ‘তুই দিলে আমরাও দিব।’ আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলাম কখন টুর্নামেন্টের জন্য নাম নিতে আসবে।

পরদিন আমাদের ক্লাসে কয়েকজন ছেলে এসে জিজ্ঞেস করল, ক্রিকেট টুর্নামেন্টে কারা কারা খেলতে ইচ্ছুক? আমি সহ আমার মেয়ে বন্ধুরা হাত তুললাম, ছেলেরা হেসে আমাদেরকে হাত নামাতে বলল। ছেলেদের কেউ ইচ্ছুক কিনা তারা সেটা জানতে এসেছে। মেয়েরা কিভাবে ক্রিকেট খেলবে সেটা তাদের বোধগম্য হল না। আমার ক্রিকেট এত পছন্দ হওয়া সত্ত্বেও, আমি সেদিন খেলতে পারলাম না, আমি মেয়ে বলে।

আমাদের বুকের সাইজ ঠিক ছেলেদের মত নয় বলে, ছেলেরা আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করবে, এই ভয়ে আমরা খেলতে পারব না। আমাদের সেই স্তনের দুধ পান করেই হয়তো কোন শিশু মোটা তাজা পুরুষ হয়ে অন্যকোন মেয়ের খেলা বন্ধের কারণ হবে।

আমি গার্লস স্কুলে পড়েছি। সেই স্কুলে তো আমি দিব্যি ক্রিকেট খেলেছি, স্কুলে একটা ক্রিকেট টীমও ছিল।
টেনিস বল নয়, কাঠের বল দিয়ে আমরা স্কুলের বাইরে অন্য স্কুলের সাথেও খেলেছি। সেসময় তো মেয়ে বলে আমার খেলায় কোন সমস্যা হয় নি। আমাদের স্কুলের মেয়েরা সারাদিন দৌড়তও, কেউ তাদের নিয়ে হাসে নি। দৌড়ানোর সময় তাদের ওড়না, জামা এসব নিয়ে কখনও ভাবতে হয় নি। 

ফেইসবুকে একদিন কেউ একজন ম্যাসেজ করল, ‘তোমার দুধ খেতে চাই’। আমি উত্তর দিলাম, ‘লাত্থি মাইরা বিচি
ফাটাইয়া বিচির রস বাইর কইরা দিমু, তারপর নিজের বিচির রস নিজে খাইশ’।
আমি জানি, এই ধরনের মন্তব্য বাস্তব জীবনে কিংবা ভার্চুয়াল জীবনে অধিকাংশ মেয়েরই শুনতে হয়েছে। ছেলেরা সাধারণত মেয়েদের বিব্রত করতে এধরনের মন্তব্য গুলো করে থাকে। তারা যখন দেখে, মেয়ে বিব্রত না হয়ে পাল্টা আঘাত করছে তখন তাদের পুরুষানুভূতি আহত হয়।

ছেলেরা মেয়েদের বুককে লজ্জা-স্থান বানিয়ে, সেই লজ্জা-স্থান নিয়ে হাসাহাসি করতে পছন্দ করে। যদি কোন মেয়ে নিজের হাত,পা, মুখের মত বুককে শরীরের স্বাভাবিক একটি অঙ্গের মত উন্মুক্ত করে, তবে ছেলেরা খুব রাগ করে। এমনিতে তসলিমা নাসরিনের শরীর ফটোশপ করে, উলঙ্গ ছবিতে তাঁর মুখ বসিয়ে দিয়ে অনেক পুরুষলিঙ্গধারীরা মজা নেয়। কিন্তু যেই না তসলিমা নাসরিন একদিন প্রেশার কুকার এক্সিডেন্টে তাঁর পুড়ে যাওয়ার কথা লিখে, পুড়ে যাওয়া হাতের সাথে, বুকের পোড়াটুকুর ছবিও দিলেন, সাথে সাথেই নিন্দার তুফান শুরু হল। কেন তসলিমা নিজের বুক এভাবে কোন রাখঢাক ছাড়াই দেখাবে? তসলিমার লজ্জা নেই। তসলিমাদের লজ্জা পেতে হবে। লজ্জা পেলেই তো সেই লজ্জার নিয়ে তসলিমাদের ভয় দেখানো যাবে, বিব্রত করা যাবে, হাসিঠাট্টা করা যাবে, দমিয়ে রাখা যাবে।

আমার মনে হয়, মেয়েদের এখন নিজের বুক নিয়ে চিন্তা ঝেড়ে ফেলা উচিত। কারণ বুক শরীরের অন্য অঙ্গগুলোর
মতোই একটি অঙ্গ। এটা যতদিন মেয়েরা ঢেকে রাখবে, ততদিন ছেলেরা বুকে ছোবল মারতে চাইবে, বিব্রত করতে চাইবে। যখন থেকে মেয়েরা নিজেদের বুক নিজেরাই উন্মুক্ত করবে, তখন ছেলেদের অনুভূতিতে আঘাত লাগবে, তারা মেয়ের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। কিন্তু এসব রাস্তার ধুলোর মত ঝেড়ে ফেলে দিয়ে স্বাধীন ভাবে চলতে পারলেই মেয়েরা নিজেদের জীবনটাকে উপভোগ করতে পারবে।

বৃহস্পতিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৫

পরাধীন বিজয় দিবস‬

বিজয় দিবসে ফেইসবুকে ঢুকেই দেখলাম অনেকে পোস্ট দিচ্ছে, তারা শাহাবাগে যাচ্ছে, সবাই একসাথে জাতীয় সঙ্গীত গাইবে, কনসার্ট করবে, বিজয় দিবস উদযাপন করবে। আর আমি দূর দেশে একা বসে ভাবছিলাম, গত বছরে আমি বিজয় দিবসে কি করেছিলাম। ২০১৪ সালের বিজয় দিবসে বন্ধুদের সাথে একটা র‍্যালিতে গিয়েছিলাম, তারপর একটা শপিং সেন্টারের পাশে সবাই মিলে আড্ডা। ২০১৩ সালে কি করেছিলাম? ২০১৩ সালে বন্ধুদের সাথে জামালখান চেরাগী পাহাড়, যেখানে চিটাগাং গণজাগরণ মঞ্চ বসে, সেখানে বন্ধুদের সাথে গিয়েছিলাম সবাই মিলে একসাথে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে। স্কুলে যদিও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় লাইনের পিছনে দাঁড়িয়ে, কিভাবে স্কুলে নতুন কোন হাঙ্গামা করা যায়, সেসব প্ল্যান করতাম। কলেজে কড়া নিয়ম থাকার কারণে, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় বন্ধুরা যারা চুলে বেনি করে আসে নি, তারা ইন্সট্যান্ট বেনি করে নিতো, কারণ জাতীয় সঙ্গীত শেষ হলেই চেকিং চলতো। আমার যেহেতু চুলের ঝামেলা নেই, তাই আমি জুতা মোজা, আইডি কার্ড, নেইম প্লেট সব ঠিকঠাক আছে কিনা চেক করে নিতাম। আর কোন কারণে আইডি কার্ড বা নেইম প্লেট না আনলে কিভাবে কড়া চেকিং এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় সেসব নিয়ে প্ল্যান করতাম।

মাঝেমাঝে খুব কলেজে যেতে ইচ্ছে করে। ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চগুলো ছিল আমার এবং আমার মত কিছু হাই লেভেলের ব্রিলিয়েন্টদের জন্য বরাদ্ধ। সকাল সাড়ে ছয়টায় কলেজের জন্য বের হতাম, বাসায় ফিরতাম দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে। দিনের প্রায় নয় ঘন্টা সময় আমি বন্ধুবান্ধব নিয়ে কাটাতাম। কলেজে কখনও একটার বেশি বই নিয়ে যাই নি, কারণ আমি কলেজে পড়তে যেতাম না, বন্ধুবান্ধব নিয়ে হৈহুল্লোড় করতাম, স্কুলেও তাই করতাম। স্কুলে ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস নাইন পর্যন্ত প্রতিবছর আমি নিয়মিত উপস্থিতির জন্য পুরষ্কার পেয়েছিলাম। আমি স্কুলে যাব না, এটা ভাবতেই পারি না। সেই আমি এখন বন্ধুবান্ধব ছাড়া, আমার মজার স্কুল-কলেজ ফেলে একা একটি অনিশ্চিত জীবনযাপন করছি, কেবলমাত্র বাংলাদেশের মত একটি স্বাধীন দেশে বসে নিজের মত প্রকাশ করেছিলাম বলে।

পাকিস্তানিদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে গিয়ে অনেকে বলে থাকেন, ‘পাকিস্তানিরা বর্বর জাতি। কারণ ৭১ এ তারা আমাদের মা-বোনদের অত্যাচার-নির্যাতন করেছে, ধর্ষণ করেছে’। পাকিস্তানিরা তাদের মা-বোনদের অত্যাচার-নির্যাতন-ধর্ষণ করেছে বলে পাকিস্তানিদের উপর ঘৃণা। আর প্রতিদিন স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে নারী নির্যাতন, ধর্ষণের পরিসংখ্যান গুলো নিয়ে কারও মাথা ব্যথা আছে? বাংলা ভাষার অধিকাংশ গালি মা বোন দিয়ে শুরু হয়। এইসব গালি আবার তাদের খুব পছন্দের।

‘নারী স্বাধীনতা’ শব্দটি এখনও স্বাধীন দেশটির অধিকাংশ পুরুষকে হাসায়। ‘নারী স্বাধীনতা আবার কি? নারীরা আমাদের মা-বোন-বউ হয়ে থাকবে, আমাদের ইচ্ছায় চলবে, এইতো!’ ইদানিং রাস্তাঘাটে হিজাব বোরখার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতা বেড়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, পুরুষের স্বাধীনতা। নারীর উপর যা খুশি তাই করার স্বাধীনতা। ইচ্ছে হলেই রাস্তায় চলতে বিরক্ত করা, ইচ্ছে হলেই ধর্ষণ করা, যৌন হয়রানি করা, ইচ্ছে হলে বিয়ে, ইচ্ছে হলেই তালাক। নারী স্বাধীনতার কথাগুলো স্পষ্ট কন্ঠে জানিয়েছিলেন তসলিমা নাসরিন। সেই তসলিমা নাসরিন আজ প্রায় একুশ বছর ধরে নিজ দেশ থেকে নির্বাসিত।

স্বাধীন দেশটিতে কেউ যদি ব্লগ, ফেইসবুকে নিজের মতামত প্রকাশ করে তবে তাকে হত্যা করা হয় এবং যার কোন বিচার তো দূরে থাক, রাষ্ট্র এই হত্যাকে কোন অপরাধের আওতায় ফেলে না।

সরকার বদলের সাথে সাথে স্বাধীনতার ঘোষকের নাম পাল্টে যায়, যুদ্ধাপরাধী একটি দল দেশে রাজনীতি করার সুযোগ পায়, সেই যুদ্ধাপরাধীদের পাশে দাঁড়ায় দেশের অন্যতম বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল, যেটি মুক্তিযোদ্ধার দল হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয়। তাদেরই ডাকা হরতালে ককটেল বোমা বিস্ফোরণে প্রাণ হারায়, পঙ্গু হয় সাধারণ মানুষ। মুক্তিযোদ্ধারা এদেশে চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারায়, আর কুখ্যাত রাজাকার বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজে শান্তিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। বিভিন্ন ইস্যুতে সংখ্যালঘুদের ঘর বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। শিশু নির্যাতন, শিশু হত্যা এখানে নিত্ত নৈমিত্তিক ব্যাপার। মায়ের পেটেও এদেশে শিশুরা নিরাপদ নয়। স্বাধীন দেশটিতে এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন ঘটনার খেতাব পায়।

সত্যি বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। এই দেশে স্বাধীনভাবে সব ধরণের অপরাধ করা যায়। অপরাধীদের জন্য এটি একটি স্বাধীন দেশই বটে।

দু'জন যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসি দেয়ার পর নাশকতার ভয়ে সারাদেশে সব ধরণের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বন্ধ করে রাখতে হয়, বিজিবি মোতায়ন করতে হয় বিভিন্ন শহরে- কাদের ভয়ে? এই শত্রুদেরই তো আমরা ৭১এ আমরা পরাজিত করেছিলাম, তবে এত ভয় কেন? ৭১এ নয় মাস যুদ্ধের পর যাদের পরাজিত করেছিলাম বলে ১৬ ডিসেম্বর দিনটিকে আমরা বিজয় দিবস পালন করি, সেই শত্রুদের থেকে কি বাংলাদেশ আজও মুক্ত হতে পেরেছে? আমরা কি ১৬ ডিসেম্বরের মর্যাদা রাখতে পেরেছি? বিজয় দিবস পালনের যোগ্যতা অর্জন করেছি?

‎নাস্তিক হত্যার বিচারেও অনুভূতিতে আঘাত লাগে‬!


অনেকদিন হয়ে গেলও কিছু লিখতে পারছি না। কি লিখব, কাদের জন্য লিখব, লিখে কি হবে--এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। এতগুলো প্রাণ নেই হয়ে গেলও শুধুমাত্র তারা দেশ নিয়ে, সমাজ নিয়ে, ভাবতো বলে। নাস্তিক মরলে দেশে কার কি যায় আসে? 
লিখতে গেলে কিছু স্বপ্ন লাগে, আশা লাগে। কিন্তু দেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে এখন ভয় হয়। অনলাইনে দেশের পত্রিকা পড়ে হতাশ হই। জানি হতাশ হবো, তবুও দেশের পত্রিকাই পড়ি। অথচ আমি এখন যেই দেশে আছি, সেই দেশের প্রধানমন্ত্রীর নামটাও জানি না।

মাঝে মাঝে মনে হয়, ঘুম থেকে উঠে যদি শুনি বাংলাদেশ বলতে কোন দেশ কখনও ছিল না, তবে খুব খুশি হবো। আমার সমস্ত ভাবনা জুড়েই বাংলাদেশ। দেশটা আমাকে হতাশা ছাড়া আর কিছুই দেয় না। দেশটা যদি নেই হয়ে যেতো, তাহলে হয়তো একটা চিন্তা মাথা থেকে দূর হতো।
আগে রাতে টিভিতে টক শো দেখতাম, আর রাজনীতি নিয়ে বাবার সাথে কঠিন আলাপ করতাম। এখন রাজনীতি নিয়ে নিজেই ভাবি, যদিও ভেবে কোন কূল কিনারা পাই না। জিয়া পরিবার দেশে খাল কেটে কুমির আনলো। কাজেই বিএনপির কাছে কারও কোন কিছু চাওয়ার নেই। তখন সব আশা ভরসা হয়ে দাঁড়ায় আওয়ামীলীগ। কিন্তু ভোটের রাজনীতিটা এখন আওয়ামীলীগও শিখে ফেলেছে। এদেশের অধিকাংশ মানুষই আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে ভোট দেয়। কাজেই যেই দলের ব্যানারে আল্লাহ খোদার নাম পাওয়া যায়, তাদের মার্কায় ভোট দিয়ে ভাবে যে, ‘যাক আল্লাহ্‌র পথেই আছি’। বিএনপি-জামায়েত ভোট পায় শুধুমাত্র এই কারণে। আওয়ামীলীগও বুঝে গেছে ভোট পেতে হলে তাদেরও ধর্মকে ব্যবহার করতে হবে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান এদেরকে আওয়ামীলীগ যতই লাথি-জুতা মারুক না কেনও, ভোট তারা আওয়ামীলীগকেই দিবে। কাজেই এদের নিয়ে আওয়ামীলীগের কোন চিন্তা নেই। চিন্তা এখন বাকি ৯০ পার্সেন্টের ভোট নিয়ে। তাই বিএনপি-জামায়েতের সাথে তাল মিলাতে আওয়ামীলীগ এখন মাঠে নামিয়েছে ওলামীলীগকে। নাস্তিক ব্লগারদের মৃত্যু নিয়ে তারা আর ঘাটাচ্ছে না। সজীব ওয়াজেদ জয় তো বলেই দিলেন যে, এটা নাকি একটা ‘সেন্সিটিভ’ ইস্যু। নাস্তিক হত্যার বিচার করলেও তো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে। আর অনুভূতিতে আঘাত লাগা মানেই ভোট কমে যাওয়া। তাতো হতে দেয়া যায় না। কাজেই মরুক কিছু নাস্তিক।
প্রতিবার কোন নাস্তিক হত্যার পর মন্ত্রী-মিনিস্টাররা স্ক্রিপটে লেখা কিছু বক্তব্য গেয়ে চলে যান, প্রতিবারই বিচারের আশ্বাস দেয়া হচ্ছে, তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে, আবার বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তদন্তের কোন অগ্রগতি নেই। ব্লগার রাজীবের খুনীরা এখন জামিনে মুক্ত হয়ে নতুন কোন ব্লগার হত্যায় মনযোগী হয়েছে। অভিজিৎ হত্যা মামলায় ও একই রকম কিছু নাটক দেখলাম। বাবু হত্যাকারীদের দুইজন পথচারী পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিলেও পরবর্তিতে সেসবের কোন খবর পেলাম না। হয়তো তারাও এখন মুক্ত হয়ে নতুন লিস্ট নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। এরপর অনন্ত হত্যা, নীলয় হত্যা- এসব মামলারও কোন খবর জানা নেই। এসব দেখে প্রকাশক দীপনের বাবা ক্ষোভে বলেছেন যে, তিনি পুত্র হত্যার বিচার চান না। হানিফ সাহবে নাকি দীপনের বাবাকে খুনীদের আদর্শের একজন বলে মন্তব্য করেছেন। আর এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, দেশে কোন জঙ্গি নেই, দেশের আইন শৃঙ্খলার অবস্থা খুব ভালো। যা ঘটছে, সবই বিচ্ছিন্ন। এরপর আর বিচার চাওয়ার কোন মানে হয়? এদিকে দেশের মানুষও সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। প্রতিটি ব্লগারের মৃত্যুর পর তারা জানতে যায়, ‘কেন মারল? কি লিখছিল? ইসলাম নিয়ে না লিখলেই তো হয়’। দেশ নিয়ে, সমাজ নিয়ে কারও কোন ভাবনা নেই।

শুনেছি, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে বিচার প্রক্রিয়া থেকে মুক্তি দিয়ে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাকামীদের বিচার চাইলো অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। বাংলাদেশ একটা স্বাধীন রাষ্ট্র। একটি রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে এসব ছাতারমাথা সংগঠনগুলো কথা বলছে, নিজেদের দাবী জানাচ্ছে। এত স্পর্ধা তাদের!
স্পর্ধা হবে নাই বা কেনও? আমাদের এখানে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে বিচার চাইতে যায় উন্নতদেশগুলোর কাছে। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে নালিশ করতে যায় উন্নতদেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের কাছে। আমরাই বুঝিয়ে দিয়েছি যে, আমরা একটা মেরুদন্ডহীন জাতি, দেশের আভ্যন্তরীন বিষয় নিয়ে কথা বলার সাহস তো আমরাই তাদেরকে দিয়েছি।
যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে এত সময় ব্যয় সহ্য হয় না। ৪২ বছর পর বিচার হচ্ছে, তাও আবার ট্রাইবুনালের রায়, এরপর সুপ্রীম কোর্টে আপিল, তারপর আবার রিভিউ। রিভিউয়ের পর আবার ক্ষমা- আরও কতকিছু। এরমধ্যে আবার রায়ের কপি নাকি লেখা শেষ হয় না। এইসব কাহিনী করতে গিয়ে জেলের ভিতরেই যুদ্ধাপরাধীদের অধিকাংশ মারা যাবে। তাও ভালো যে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে মারা যাবে, মন্ত্রী হিসেবে নয়। আওয়ামীলীগের কাছে পাওয়া বলতে এতটুকুই। আর বাকি সবকিছুই এখন দুইদলেরই এক। দেশ নিয়ে এখন আর কিছু ভাবতে ইচ্ছে হয় না। কাকে ভরসা করে দেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখব? দেশের স্বার্থেই আওয়ামীলীগ-বিএনপির বিকল্প কিছু ভাবার সময় এসেছে কি?

‪ফেইসবুকহীন নিরাপদ দেশটির গল্প‬


কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, সাকা চৌধুরী, মুজাহিদ এই পর্যন্ত চারজনের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। আমার জন্য, যুদ্ধাপরাধীর রায় কার্যকর মানেই ছিল বইখাতা বন্ধ করে টিভির সামনে বসে থাকা। কাদের মোল্লার রায় কার্যকরের দিন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে, মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটিতে কুখ্যাত ঘাতকের বিচার হচ্ছে!বিভিন্ন চ্যানেলে তার কুকর্মের কথাগুলো বর্নণা করা হচ্ছিল, সেসব দেখছিলাম, আর রাগে ফেটে পড়ছিলাম। কামারুজ্জামানের রায় কার্যকরের দিন বিনা নোটিশে স্যার পড়াতে চলে এলেন। স্যারকে সাথে নিয়েই সেদিন কামারুজ্জামানের কুকর্মের কাহিনী শুনলাম, স্যারের সাথে রাজনৈতিক আলাপ করলাম, সাথে বাবাও এসে যোগ দিলেন। গত ২২শে নভেম্বর, কুখ্যাত দুই যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহাসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হল। আমি দেশের বাইরে। জাগো বিডি ওয়েব সাইট থেকেই সাধারণ আমি বাংলাদেশের চ্যানেল গুলো দেখি, কিন্তু সেদিন জাগো বিডি সাইটটা স্লো হয়ে গেলও। প্রবাসীরা সবাই নিশ্চয়ই এই একটি ওয়েব সাইটের মাধ্যমে দেশের খবর শুনছিল। সাইট স্লো, এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর শোনার সময় বারবার আটকে যাচ্ছিল, রেগে গিয়ে হয়তো ল্যাপটপ ভেঙ্গে ফেলতে পারি, এই ভয়ে ল্যাপটপটা হাতের নাগালের বাইরে রেখে, নাওয়া খাওয়া বন্ধ রেখে নিউজ শুনছিলাম। ভেবেছিলাম রাত ১০টার মধ্যেই হয়তো ঝুলিয়ে দেয়া হবে। ১১টায়ও যখন ফাঁসি কার্যকর হচ্ছে না, তখন মনে মনে খুব চাইছিলাম আরেকটু দেরী হোক, ১২টা ক্রস করুক। ফাঁসির তারিখটা ২১শে নভেম্বর না হয়ে যেন ২২শে নভেম্বর হয়। অবশেষে বাংলাদেশ সময়ে ১২টা ৫৫ মিনিটে ফাঁসি কার্যকর হল। কাজেই দিনটাকে ২২শে নভেম্বর ধরাই যায়। ২২শে নভেম্বর আমার জন্মদিন। জন্মদিনটা ফেইসবুক প্রোফাইলে হাইড করে দিয়েছিলাম যাতে কেউ দেখতে না পায়। কিন্তু কয়েকজন বন্ধু মনে রেখেছিল, তারা ওয়ালে পোস্ট করার পর, অনেকেই শুভেচ্ছাবার্তা পাঠাতে শুরু করল। জানা যখন হয়েই গেলও, ভাবছিলাম সুকান্ত ভট্টাচার্যের আঠারো বছর বয়স কবিতাটা পোস্ট করব, শেষ পর্যন্ত আর করা হল না। এই বয়স নিয়ে কম ভোগান্তি হয় নি। তবে ছোট থাকার অনেক উপকারিতাও আছে। সব ভুলত্রুটিগুলো ছোট বলে মাফ পাওয়া যায়। কিন্তু বড় হয়ে গেলে এই সুবিধাটুকু আর পাওয়া যায় না। জগতের জটিল সব বিষয়গুলো নিয়ে ছোটদের ভাবতে হয় না। কিন্তু আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলেই মানুষ নিজেকে জটিল সবকিছুতে জড়িয়ে ফেলে। আমি ছোট থাকতে চাই, ভুল করার পর বয়সের অজুহাতে ক্ষমা পাওয়ার সুবিধাটুকু পেতে চাই সবসময়। জটিল কোনকিছুতে নিজেকে জড়াতে চাই না।

শুনেছি কিশোরী ঐশীর নাকি ফাঁসির রায় হয়েছে? ঐশী তার পুলিশ বাবা ও মাকে খুন করেছে। ঐশী মাদকাশক্ত ছিল। খুনের সময় তার বয়স ছিল ১৮ বছরের কম। বয়স বিবেচনায়, ঘাতক গোলাম আজম যাবজ্জীবন সাজা পেলও, অথচ ঐশীর বেলায় বয়স বিবেচনায় আনা হল না!

ঐশীর এই পরিণতিতে ঐশী একা দায়ী নয়, একজন ঐশীকে ফাঁসি দিলেই সমাজে আরেকজন ঐশী সৃষ্টি হবে না, এমন নিশ্চয়তা কি দেয়া সম্ভব হবে? ঐশীর বয়স অল্প ছিল, সে যে ভুল করেছে সেটাই তাকে বুঝতে দেয়া হল না, তাকে তার অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয়ে নিজেকে সংশোধনের সুযোগ দেয়া হল না। হ্যাঁ, আমি ঐশীর ফাঁসির বিপক্ষে। কেবল ঐশী না, আমি চাই সব মানুষকেই নিজের ভুল বোঝার, অনুতপ্ত হওয়ার, ভুল সংশোধের সুযোগ দেয়া হোক। তবে যুদ্ধাপরাধীর কথা আলাদা।

মৃত্যুর আগ মুহুর্ত পর্যন্ত কাদের মোল্লা নিজের কৃত কর্মের জন্য অনুতপ্ত তো দূরের কথা, ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে গেলও। কামারুজ্জামানের মৃত্যুর পর তার পরিবার মিডিয়ায় ‘ভি’ চিহ্ন প্রদর্শন করেছে। সাকা-মুজাহিদ ক্ষমা চাওয়ার নাটকটা করে, চেয়েছিল হয়তো একদিন বেশি বাঁচতে পারবে, কিন্তু যখন দেখল এতে কাজ হচ্ছে না, তখন তার পরিবারের সদস্যরা বাইরে এসে জানিয়ে দিলো তাদের বাবা ক্ষমা চায় নি। এইসব যুদ্ধাপরাধীরা কেবল মুক্তিযুদ্ধের সময়ই অপরাধ করে নি, যুদ্ধ পরবর্তি সময়ে দেশে এসে তারা বিএনপি সরকারের আমলে পুনর্বাসিত হয়ে নিজেদের কুকর্ম অব্যাহত রেখেছে। আর এই অপরাধীদের যদি কোন ভাবে ক্ষমা করা হয়, তবে ভবিষ্যতে সরকার বদলের পরই তারা জেল থেকে মুক্ত হয়ে, ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যের সাথে জড়িত প্রত্যেক সদস্যকে হত্যা করবে। বিচার চলাকালীনই কিছু সাক্ষীকে হত্যা করা হয়েছে, আহত করা হয়েছে। কাজেই এইসব পশুর প্রতি মানবতা দেখানোর ভুলটা আমি করছি না। তবে কথা হল, এই কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দিলেই কি দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? জঙ্গিবাদ নির্মূল হয়ে যাবে? তা কিন্তু না। দেশে জঙ্গিবাদের চাষ ঠিকই হচ্ছে, বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ জঙ্গিবাদের চাষের দিকে নজর না দিয়ে আমাদেরকে ঢেড়স চাষের পরামর্শ দিয়েছেন। বর্তমান বুদ্ধিজীবীদের এই জাতীয় মন্তব্য শুনেই বুঝতে পারি, ৭১ এ ঘাতকরা জাতিকে অনেকটুকুই মেধাশুণ্য করতে পেরেছে।

একের পর এক মুক্তমনা মানুষ হত্যা চলছে, কেবল নাস্তিক মুক্তমনা নয়, বিদেশী নাগরিক হত্যা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া—এসবই নির্বিঘ্নে ঘটে চলেছে। সরকার যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি দিচ্ছে, এর জন্য ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু এইসব ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনাগুলোর দিকেও কি তারা একটু নজর দিবেন? নাকি এখনও ৪৪ বছর হয়নি বলে বিচার কার্য শুরু করা যাচ্ছে না?

আবার দেশের মানুষের নিরাপত্তার দোহায় দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এই অবস্থাতেও হত্যা উৎসব চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে কি কোন ফল পেয়েছে? দেশের মসজিদ মাদ্রাসায় মগজ ধোলায় চলছে, নাস্তিক হত্যাকে ‘সেন্সিটিভ’ ইস্যু আখ্যা দিয়ে অপরাধীদের উৎসাহ দেয়া হচ্ছে—এইগুলো যদি পারেন বন্ধ করেন, সুফল পাবেনই, নিশ্চিত।