সোমবার, ৯ মে, ২০১৬

বেশ্যা!

‘বেশ্যা’ শব্দটাকে আমরা সাধারণত গালি হিসেবে ব্যবহার করি। আমার ধারণা বেশ্যারা খুব সাহসী হয়। আমাদের সমাজে নারীকে দমিয়ে রাখার প্রধান অস্ত্রটি হল ‘চরিত্র’। পুরুষ নাকি চাইলে পারে, নারীর চরিত্র ‘নষ্ট’ করতে। সীমার বাইরে গেলেই নারীকে ‘সম্ভ্রম’ হারানোর ভয় দেখানো হয়। নারীর সম্ভ্রমটির অবস্থানটা ঠিক কোথায়? যোনির ভেতরে নাকি?

একমাত্র এই ভয়ের কাছে পরাজিত হয়েই নারী আজও বন্দী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কাছে। এই ভয়ই নারীকে বাধ্য করছে পুরুষের আধিপত্য মেনে নিতে।
ঘরে বাইরে সব জায়গায় যৌন সন্ত্রাসীরা ওঁত পেতে থাকে, নারীর চরিত্র নষ্ট(!) করতে। আর যৌনসন্ত্রাসীদের চরিত্র নষ্ট হয় কিসে শুনি?

বেশ্যাদের তো এসব ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। বেশ্যারা তথাকথিত ‘চরিত্র’ ‘সম্ভ্রম’ এর তোয়াক্কা করে না। তাই তারা অন্য যে কোন নারীর চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন ও সাহসী। বেশ্যাদেরকে পুরুষের সৃষ্ট চরিত্র রক্ষা করতে হয় না বলে, তারা তাদের জীবনে পুরুষের আধিপত্য মেনে নিতেও বাধ্য নয়।

আর নির্লজ্জ পুরুষজাতটার কথা আর কি বলব। দিনে যাদের বেশ্যা বলে থুতু ছিটায়, রাতে তাদের খদ্দের হয়ে থুতু চাটতে যায়। বেহায়া হলে কি আর এতটা বেহায়া হতে হয়!

পুরুষের প্রয়োজনেই নারী বেশ্যা হয়। কিন্তু বেশ্যা হওয়ার পর বেশ্যা নারীর কাছে ওসব চরিত্র-টরিত্র কোন পাত্তা পায় না। চরিত্রকে তোয়াক্কা না করার এই সাহসটাকেই পুরুষ ভয় পায়, ঘৃণা করে। ওই সাহসের অংশটুকু বাদ দিলে বেশ্যা ব্যাপারটা বেশ মজাদার হয়ে উঠে।

বেশ্যা মানে যদি বহুগামী নারী হয় বহুগামী পুরুষকে তবে কি বলা যায়? পুরুষ নারীকে মাতৃত্ব, সতীত্বের গুন শোনায়। অথচ সমাজের অধিকাংশ পুরুষই বহুগামী। পুরুষের বহুগামীতা আবার একটা বিশেষ গুণ। এটা নাকি পুরুষের সক্ষমতাকে বোঝায়! আর নারী বহুগামী হলেই নাকি বেশ্যা!

কিছুদিন আগে কিছু অনলাইন পত্রিকায় নিউজ দেখলাম, ঢাকায় নাকি ধনী ঘরের মেয়েরা বয়ফ্রেন্ড ভাড়া করছে। ধনী মেয়েরা ছেলেদের ভাড়া করছে নিজেদের যৌন চাহিদা মেটাতে। এই খবর কতটা সত্য জানি না। হয়তো সত্য, হয়তো মিথ্যা। এই খবরের শিরোনাম করা হয়েছে ‘কোথায় যাচ্ছে এই সমাজ’। আপনারা আমাকে বলুন তো, ‘কোথায় ছিলো এই সমাজ’? বেশ্যালয়গুলোর খদ্দের হয় কারা? কারা টিকিয়ে রাখছে পতিতাবৃত্তি? বেশ্যালয় বন্ধের কথা বললে, সমাজে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার অজুহাত দেখানো হয়, ইনিয়ে বিনিয়ে বেশ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। তখন কোথায় যায় এই সমাজ-প্রশ্ন তুলেছেন কি? তখন এই শিরোনাম দানকারীরাই বা কোথায় থাকে?

শেখ হাসিনা নাস্তিক হত্যার দায় নিবেন না বলাতে চারদিকে সমালোচিত হচ্ছেন। আমরা বলছি, তিনি হত্যাকারীদের উৎসাহিত করছেন। কেউ একবার ভেবে দেখছেন, যুগ যুগ ধরে পুরুষ নারীর উপর আধিপত্য বিস্তার করতে নারীকে অত্যাচার করেছে, ধর্ষন করেছে, এর দায় যে শুধুই পুরুষের, এটা আমরা কয়জন মানি? উল্টো পুরুষকেই বানিয়েছি নারীর রক্ষাকর্তা! পুরুষ নারীর রক্ষক হলে, ভক্ষকটা তবে কে?

আসলে রক্ষক-ভক্ষক সব একই সুত্রে গাঁথা। রক্ষক পুরুষ চায় না নারী স্বাধীন ভাবে চলুক, নিজের কথা নিজে বলুক, নিজের দায়িত্ব নিজে নিক। রক্ষক চায় নারী ভয় পাক, ভয়ে গুটিয়ে থাকুক, নিজেকে দূর্বল ভেবে তার কাছে ছুটে যাক নিরাপত্তার জন্য, তার আধিপত্য মেনে নিক। আর রক্ষকের এই চাওয়াগুলো বাস্তবে টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে ভক্ষক পুরুষ।

পুরুষতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই কেউ রক্ষক, কেউ বা ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। যেদিন নারীর আর রক্ষকের প্রয়োজন হবে না, সেদিন থেকে আর নারীকে পুরুষের আধিপত্য মেনে নিতে হবে না।

নারী জানুক যে, তার নিরাপত্তার জন্য কোন পুরুষের প্রয়োজন নেই। নারী নিজেই নিজের রক্ষক হয়ে উঠুক। নারী জানুক তার সম্ভ্রম তার যোনিতে নয়, নারীর সম্ভ্রম নারীর কর্মে, জ্ঞানে।

মঙ্গলবার, ৩ মে, ২০১৬

ব্লগার ও লেখক হত্যা - ব্লগারদের যৌথ বিবৃতি


আমরা, গভীর বেদনা ও উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে বাংলাদেশে মুক্তমনা, নাস্তিক লেখক, প্রকাশক, ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং ধর্মীয় ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার ব্যক্তিবর্গ ইসলামি জঙ্গিবাদের হাতে একের পর এক হত্যা ও আক্রমণের শিকার হলেও এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো কার্যকর আইনি ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নেবার পরিবর্তে নিহত ও আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গের উপর দায় চাপানোর এক নতুন সংস্কৃতি চালু করা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী দেশের সকল নাগরিক আইন দ্বারা সুরক্ষা লাভের অধিকারী এবং সবার মত প্রকাশের অধিকার থাকা সত্ত্বেও গত ১৪ এপ্রিল ২০১৬ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বলেছেন, কেউ ধর্মের সমালোচনামূলক লেখালেখির কারণে খুন হলে সরকার তার দায়িত্ব নেবে না। এই ঘোষণার দ্বারা নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব অস্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী সংবিধান এবং নাগরিকদের প্রতি তাঁর অঙ্গিকার থেকে স্পষ্টত সরে গেছেন এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র, অনলাইন এক্টিভিস্ট খুন হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, “সে ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর লেখালেখি করত কী না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন... আগের যে হত্যাকাণ্ডগুলো হয়েছে তাদের ব্লগ যদি দেখেন, এভাবে মানুষের ধর্মে আঘাত দেওয়া, বিশ্বাসে আঘাত দেওয়া, পৃথিবীর কোনো দেশেই তা গ্রহণযোগ্য নয়”। ইসলামি জঙ্গীদের আক্রমণে সমকামী আন্দোলনের দু’জন কর্মী খুন হলে একই কায়দায় তিনি মন্তব্য করেন “আমাদের সমাজে সমকামিতা মানানসই নয়”। পুলিশের মহাপরিদর্শক জনাব এ কে এম শহীদুল হক গত ২৬ এপ্রিল ব্লগারদের নিরাপত্তা প্রদান এবং গুপ্ত ঘাতকচক্র দমনে তার বাহিনীর অপারগতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “পুলিশ ঘরে ঘরে পাহারা দিতে পারবে না, নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদেরকেই নিতে হবে"। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ প্রধানের এহেন বক্তব্য দায়িত্বহীন, অপেশাদারসুলভ এবং উদ্বেগজনক। এছাড়াও সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোঃ আছাদুজ্জামান মিয়া স্বীকার করেছেন যে, তাদের নজরদারীতে থাকা লেখক অভিজিৎ রায় ও প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনের কয়েকজন খুনী দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে! পুলিশের নজরদারীতে থাকা খুনীদের দেশ ছেড়ে পালানোর ঘটনা থেকে যৌক্তিকভাবেই সন্দেহ হয় যে, ব্লগার হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারে সরকার তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহের ইচ্ছা ও আগ্রহের অভাব রয়েছে। এছাড়া সরকার ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের এই ধরনের মন্তব্য ও বিবৃতি উগ্র সাম্প্রদায়িকতা এবং জঙ্গীবাদকে উস্কে দেয়ার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রাখতে খুনিচক্রকে অধিক মাত্রায় উৎসাহিত করছে। অন্য দিকে ভিন্নমত ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের উপর হামলাকারীকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হিসেবে দেখিয়ে দায় থেকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে; অথচ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের ইসলাম নিয়ে কথিত কটুক্তির অভিযোগ এনে জেলে ভরা হচ্ছে।

হেফাজতে ইসলাম এর আমীর আল্লামা আহমদ শফি যখন প্রকাশ্যে “নাস্তিকদের কতল করা ওয়াজিব হয়ে গেছে” বলে ফতোয়া দেন এবং সারাদেশে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল, খুৎবায় নানাস্তরের জঙ্গীবাদী ইমাম, আলেম, খতিবরা নাস্তিকদের খুনের প্রকাশ্য ফতোয়া দিতে থাকেন, তখনও আমরা সরকারকে কোনো আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখি না। একই সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের অঙ্গসংগঠন পরিচয় দিয়ে ‘আওয়ামী ওলামালীগ’ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিস্তারে পাল্লা দিয়ে কাজ করছে। হেফাজতে ইসলামের সাথে সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের যোগাযোগ এবং তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করার বিষয়টিও আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। উপরন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ উগ্র মৌলবাদীদের সাথে দফায় দফায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী চুক্তি করছে এবং রাষ্ট্র ও সমাজকে সাম্প্রদায়িকীকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামীলীগসহ ক্ষমতাসীন ১৪ দল তথা মহাজোট এবং তাদের সহযোগী সংগঠনসমূহ এসকল হত্যা-খুনের প্রতিকার প্রশ্নে নীরব থাকছে অথবা দলীয় ও জোট নেত্রীর দেখানো পথে আক্রান্তদেরই দোষারোপ করা হচ্ছে। পাশাপাশি, সংঘটিত হামলাগুলোর দায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আনসার-আল ইসলাম (আল-কায়েদার ভারত উপমহাদেশীয় নেটওয়ার্কের বাংলাদেশ শাখা) এবং আইএস স্বীকার করলেও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ওস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে আইএস, আল কায়দা প্রভৃতি জঙ্গী সংগঠনের উপস্থিতিকে অব্যাহতভাবে অস্বীকার করে চলেছেন, যা মূলত সত্যকে আড়াল করে সরকারের উগ্র মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদের সাথে সমঝোতা করে চলার কৌশল বলে আমরা মনে করি। অপরদিকে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রু জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় ২০ টি ইসলামপন্থী দলের সাথে রাজনৈতিক জোট গঠন করেছে, যাদের অধিকাংশই জঙ্গীবাদের মদদদাতা কিংবা সরাসরি যুক্ত। ফলে সরকারি কিংবা বিরোধীদল কোনো পক্ষ থেকেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে জঙ্গীবাদ মোকাবেলার কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

জঙ্গী গুপ্তঘাতকদের আক্রমণের পাশাপাশি সরকার লেখক, প্রকাশক, ব্লগার ও মুক্তচিন্তার মানুষদের গ্রেফতার ও হয়রানি করছে। ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬’ (২০১৩ সালে সংশোধিত) এর ৫৭ ধারা প্রয়োগ করে লেখক ও ব্লগারদের মুখ বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা চলছে। ফলে দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ভয়াবহ হুমকীর মুখে পড়েছে। ২০১৩ সালে হেফাজত ইসলামের দাবির প্রেক্ষিতে ৪ জন ব্লগারকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের কথিত অপরাধে ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করা হয়। হেফাজতকে সন্তুষ্ট করতেই ২০১৩ সালে ‘তথ্য ও প্রযুক্তি আইন ২০০৬’ এর সংশোধনী এনে সর্বোচ্চ সাজা বাড়িয়ে ১৪ বছর এবং সর্বনিম্ন সাজা ৭ বছর করা হয়। হেফাজতে ইসলাম ও ওলামা লীগের মতো উগ্র মৌলবাদীদের দাবির মুখে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি ২০১৫ সালে রোদেলা প্রকাশনী এবং ২০১৬ সালে ব-দ্বীপ প্রকাশনীকে বইমেলা থেকে নিষিদ্ধ করে। এছাড়া ২০১৬ সালে ব-দ্বীপ প্রকাশনীর প্রকাশককে ৫৭ ধারায় গ্রেফতারও করা হয়। বস্তুত ২০১৩ সাল থেকেই ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে’ আঘাতের এইরকম কথিত অভিযোগে ৫৭ ধারায় গ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। স্কুলশিক্ষক, দর্জি, আদিবাসী, ছাত্র, বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এরকম ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগের মাধ্যমে গ্রেফতারের ঘটনাও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কেউ একবার এই অভিযোগে গ্রেফতার হলে, তিনি ধর্ম অবমাননাকারী হিসাবে চিহ্নিত হয়ে যান এবং তাকে প্রাণনাশের হুমকী মাথায় নিয়ে জীবনযাপন করতে হয়। সর্বশেষ আক্রমণে এরকমই একজন, ৫৭ ধারায় মামলাপ্রাপ্ত হিন্দু দর্জি জঙ্গীদের চাপাতির আঘাতে খুন হন। এসব কালাকানুন এবং সরকারের কর্তাব্যক্তিদের ক্রমাগত ‘সীমা লংঘন’ না করার হুমকি, বিপন্ন লেখক ও ব্লগারদের নিরাপত্তা সহায়তার জন্যে পুলিশের শরণাপন্ন হওয়ার সকল পথ বন্ধ করা হয়েছে। একদিকে জঙ্গীদের ভয়, অন্যদিকে ৫৭ ধারায় গ্রেফতারের ভয় - উভয় সংকটে পড়ে আজ মুক্তমনা লেখক, ব্লগার ও প্রকাশকদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক জীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত।
আমরা ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া বাংলাদেশের লেখক, ব্লগার, প্রকাশক ও এক্টিভিস্টদের লেখালেখির জন্য দায়ি করে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় হতে প্রদত্ত বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানাচ্ছি - তারা যেন ধর্ম, বিশ্বাস ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষায় দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী তথা যাবতীয় ইসলামপন্থী ও জঙ্গীবাদী রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করার জন্য সরকার ও ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রতি জোরালো আহ্বান জানাই। ইসলামপন্থী ও জঙ্গীবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দেশের বৃহত্তম বিরোধীদল বিএনপি’র প্রতি আহ্বান জানাই। আমরা বিবদমান রাজনৈতিক শক্তিসমুহকে জঙ্গীবাদ দমনের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদে সামিল হওয়ার জন্য দেশের বুদ্ধিজীবি, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, ছাত্র, সংস্কৃতি কর্মীসহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষের প্রতি আহ্বান জানাই।

একই সাথে আমরা দাবি জানাচ্ছি-

১। বাংলাদেশে এ যাবৎ সংঘটিত লেখক, ব্লগার, অনলাইন একটিভিস্ট, ভিন্ন ধর্ম ও মতে বিশ্বাসী, সমকামী আন্দোলনের কর্মী এবং নাস্তিক- মুক্তমনাদের হত্যা ও হত্যাপ্রচেষ্টার সাথে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।
২। দেশের সর্বস্তরের মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার সকল দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। ধারাবাহিক আক্রমণের শিকার মুক্তমনা ও সেক্যুলার লেখক, ব্লগার, প্রকাশক, ভিন্ন ধর্ম ও মত-পথে বিশ্বাসী, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তায় কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। সরাসরি হুমকিপ্রাপ্ত লেখক, ব্লগার, শিক্ষক, আন্দোলনকর্মী, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, সংখ্যালঘু সংগঠনের সাথে জড়িতদের জন্য জরুরি উদ্যোগে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।
৩। সংবিধান বর্ণিত বিবেক ও চিন্তার স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সমানভাবে ধর্ম পালন ও প্রচারের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় ও অবিশ্বাসী- নাস্তিক- মুক্তমনাদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। সংবিধানের ৮, ১২ ও ২৮ ধারার সাথে সাংঘর্ষিক ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ সম্বলিত ২(ক) ধারা বাতিল করতে হবে। সংবিধানের ৩৯ ধারার চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক-ভাব প্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬’ (২০১৩ সালে সংশোধিত) এর ৫৭ ধারা বাতিল করতে হবে।
৪। ফেসবুক-টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সেক্যুলার ব্লগারদের প্রকাশ্যে হত্যার হুমকী প্রদানকারী উগ্র মৌলবাদী ব্যক্তিবর্গকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অনলাইন, মুদ্রিত গণমাধ্যম এবং টিভি চ্যানেলে জঙ্গীবাদী প্রবণতা এবং লেখক- ব্লগার- শিক্ষক- সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি হুমকিমূলক উস্কানি প্রভৃতিকঠোরহস্তে দমন করতে হবে।
৫। জামায়াতে ইসলামী, ওলামালীগ ও হেফাজতে ইসলামসহ জঙ্গীবাদের সাথে যুক্ত সকল সাম্প্রদায়িক দল এবং ইসলামি উগ্রপন্থী গোষ্ঠী নিষিদ্ধ করতে হবে এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গীবাদী গোষ্ঠীর সকল ধরনের কর্মতৎপরতা প্রতিহত করতে সরকারকে সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে হবে। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে।
৬। সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত ও আক্রান্ত ব্যক্তিদের লেখালেখির জন্য কিংবা তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য দোষারোপ বন্ধ করতে হবে। মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক, ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষকসহ পেশাজীবি ব্যক্তিদের কথিত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে গ্রেফতার ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে এবং ব-দ্বীপ প্রকাশনীর প্রকাশক শামসুজ্জোহা মানিকসহ গ্রেফতারকৃত সকল সেক্যুলার লেখক, ব্লগার, প্রকাশক, অনলাইন এক্টিভিস্ট এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবি ব্যক্তিদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।
৭। কওমি মাদ্রাসাসমূহের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং মাদ্রাসার পাঠ্যসূচি থেকে সকল প্রকার সালাফি, ওহাবি ও মওদুদীবাদী মতাদর্শ বাতিল করতে হবে। জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য মৌলবাদী সংগঠন পরিচালিত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কিন্ডার গার্টেন স্কুল, কোচিং সেন্টার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে বিশেষ কোনও ধর্ম শিক্ষা দিয়ে গোড়ামী এবং ধর্মান্ধতা সৃষ্টির পরিবর্তে সকল ধর্মমত ও যুক্তিসিদ্ধ মতবাদসমূহ যুগপৎ শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে। জঙ্গী উৎপাদনের সুযোগ বন্ধ করতে, প্রয়োজনে মাদ্রাসাসমূহ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ আইন প্রণয়ন করতে হবে।
৮। জুম্মাহর খুৎবা ও ওয়াজ মাহফিলে উগ্র মৌলবাদী প্রচারণা, অন্য ধর্মালম্বীদের প্রতি বিষোদগার ও জঙ্গীবাদ সংগঠিত করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। গণমাধ্যমে একক ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচার করে ধর্মান্ধতা সৃষ্টির পরিবর্তে মানুষকে নির্মোহভাবে সকল ধর্মমত জানার সুযোগ দিতে হবে। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, নাস্তিক্যবাদ, মানবতাবাদ, যুক্তিবাদ, দর্শন এবং বিজ্ঞানের উন্মুক্ত প্রচারণার সুযোগ দিতে হবে।
৯। যুদ্ধাপরাধের বিচার ত্বরান্বিত করতে হবে।


                                                        বিবৃতিদাতা ব্লগ ও ব্লগারদের তালিকা
ব্লগসমূহ:
নবযুগ ব্লগ, ইস্টিশন ব্লগ, উইমেন চ্যাপ্টার, মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট, চুতরাপাতা, ধর্মকারী, ইতুর ব্লগ, অগ্নিরথ প্রমুখ 

লেখক, কবি, ব্লগার ও অনলাইন একটিভিস্ট:
(জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়, ইংরেজি বানানের বর্ণনানুক্রমিকভাবে নাম সাজানো হয়েছে)
A.Z Hossain (এ,জেড হোসেন)
Abul Kashem (আবুল কাশেম)
Ahmedur Rashid Tutul (আহমেদুর রশীদ টুটুল )
Ajanta Deb Roy (অজান্তা দেব রায়)
Akash Malik (আকাশ মালিক)
Alamgir Hussain (আলমগীর হুসেন)
Allama Shoitan (আল্লামা শয়তান)
Ananya Azad (অনন্য আজাদ)
Anju Ferdousy (আঞ্জু ফেরদৌসী)
Arif Rahman (আরিফ রহমান)
Arifur Rahman (আরিফুর রহমান)
Arpita Roychoudhury (অর্পিতা রায়চৌধুরী)
Ashraful Alam (আশরাফুল আলম)
Asif Mohiuddin (আসিফ মহিউদ্দীন)
Bhajan Sarker (ভজন সরকার)
Bonya Ahmed (বন্যা আহমেদ)
Camelia (ক্যামেলিয়া)
Chorom Udash (চরম উদাস)
Daripalla Dhomadam (দাঁড়িপাল্লা ধমাধম)
Daud Haider (দাউদ হায়দার)
Deepaboli Chowdhury (দীপাবলী চৌধুরী)
Dhrubo Tara (ধ্রুব তারা)
Ekush Tapader (একুশ তাপাদার)
Ettila Etu (ইত্তিলা ইতু)
Farzana Kabir Khan (ফারজানা কবীর খান)
Horus (হোরাস)
Iswar Kona (ঈশ্বর কণা)
Kazi Mamun (কাজী মামুন)
Khalid Hasan Alo (খালিদ হাসান আলো)
Mahbub Leelen (মাহবুব লীলেন)
Mahmudun Nabi (মাহমুদুন নবী)
Mahsina Khatun (মহসিনা খাতুন)
Maskwaith Ahsan (মাস্কাওয়াথ আহসান)
Md. Mumin Banda (মোঃ মুমিন বান্দা)
Milan Farabi (মিলন ফারাবী)
Mohiuddin Sharif (মহিউদ্দিন শরীফ)
Monika Muna (মণিকা মুনা)
Muhammad Golam Sarowar (মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ার)
Nastiker Dharmakatha (নাস্তিকের ধর্মকথা)
Nur Nobi Dulal (নুর নবী দুলাল)
Omar Farooq Lux (ওমর ফারুক লুক্স)
Poruya (পড়ুয়া)
Prithu Sanyal (পৃথু স্যন্যাল)
Raihan Abir (রায়হান আবীর)
Rubina Khanam (রুবিনা খানম)
Sabbir Hossain (সাব্বির হোসাইন)
Saikat Barua (সৈকত বড়ুয়া)
Sannyasi Ratan (সন্যাসী রতন)
Sezan Mahmud (সেজান মাহমুদ)
Shahzahan Bachchu (শাহজাহান বাচ্চু)
Shamim Runa (শামীম রুনা)
Shamima Mitu (শামীমা মিতু)
Shammi Haque (শাম্মি হক)
Shantanu Adib (শান্তনু আদিব)
Shohiduzzaman Paplu (সহিদুজ্জামান পাপলু)
Shoikot Chawdhury (সৈকত চৌধুরী)
Shravan Akash (শ্রাবণ আকাশ)
Shubhajit Bhowmik (শুভজিৎ ভৌমিক)
Sobak (সবাক)
Subrata Shuva (সুব্রত শুভ)
Supriti Dhar (সুপ্রীতি ধর)
Susupto Pathok (সুষুপ্ত পাঠক)
Swapan Majhi (স্বপন মাঝি)
Syed Kamran Mirza (সৈয়দ কামরান মির্জা)
Syed Zamal (সৈয়দ জামাল)
Tahsib Hasan (তাহসিব হাসান)
Juliyas Caesar (জুলিয়াস সিজার)
Moon Taslima Sheikh (মুন তাসলিমা শেখ)

শুক্রবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১৬

কতটা জল ধরলে চোখে শ্যাওলা জমে যায়

নাস্তিক ব্লগাররা এখন বাংলাদেশের মিডিয়ার জন্য বড় নিউজ। এদেরকে কিছুদিন পরপর রাস্তায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সেসব নিয়ে টক শো হয়, ব্রেকিং নিউজ হয়, রাজনীতি হয়। ব্লগারদের নিয়ে দেশের অনেকেরই প্রচুর আগ্রহ। ওরা কি লিখে? কেন লিখে? দেশের সুশীল-বুদ্ধিজীবি সমাজ ব্লগারদের নির্বুদ্ধিতার কথা ভেবে মুচকি হাসে, ‘কি দরকার তাদের এসব লেখালেখির, মুখ খুললেই মৃত্যু যখন জানোই তাহলে বাপু মুখ খুলতে যাও কেনও?’
ব্লগারদের অনেকেই দেশে এখন লুকিয়ে আছে, পালিয়ে বেড়াচ্ছে। দেশ থেকে বের হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু নিজের দেশ, নিজের মানুষদের ফেলে হুট করে বললেই তো চলে যাওয়া যায় না।

পরিচিত এক ব্লগার, যে তার পরিবারের একমাত্র ভরসা। তার রোজগারের উপর নির্ভর করে মা-বাবা-ভাই-বোনের জীবন। দিনে আনে দিনে খায় অবস্থা। তাকে নিয়মিত ফলো করা হচ্ছে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবিকার তাগিদে তাকে কাজে বের হতে হচ্ছে। ওদিকে ঘরেও তো নিরাপত্তা নেই। ঘরে এসে কুপিয়ে যাচ্ছে। এই যার অবস্থা সে কিভাবে সব দায়িত্ব ফেলে দেশ ছাড়ার কথা ভাববে? অথচ দেশ ত্যাগ ছাড়া তার জীবন বাঁচানোর আর কোন রাস্তাও নেই।
এমন অনেক ব্লগার আছে, যারা নাস্তিক হওয়ার কারণে পরিবার থেকে আলাদা। নিজের পরিবার যাদেরকে ত্যাজ্য বলে দেয় সেখানে তারা এই অবস্থায় আর কার কাছে আশ্রয় চাইবে?

মেয়েকে বাবা বিয়ে দিতে চায়। আর মেয়ে পড়ালেখা শেষ করতে চায়। প্রথমত বাবার কথার বিরুদ্ধে গিয়ে পড়ালেখা করছে। দ্বিতীয়ত, মেয়ে নাস্তিক, লেখালেখি করে। এসব জানার পর বাড়ি থেকে টাকা আসা বন্ধ। মেয়ে চলছে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে। এই অবস্থায় নিজের খরচ জোগাতে টিউশনি করে। জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়তে হবে। অর্থের যোগান দিবে কে? অর্থ না হয় কোন ভাবে পেয়েই গেলো, দেশ ত্যাগ করতেও সক্ষম হল, তারপর? এরপর কি করবে? নতুন পরিবেশ, নতুন দেশে কোথায় থাকবে, কি করবে?

দেশে যার লেখাপড়া শেষ করে, নিশ্চিত একটা সচ্ছল জীবনযাপন করার কথা, সে এখন ইউরোপের কোন একটি দেশে রিফিউজি হিসেবে বেঁচে আছে।
শিক্ষকরা যাকে নিয়ে ভাবতো যে, এই ছাত্র বিসিএস এ টিকে যাবে। সেই ছাত্র সব ছেড়ে এখন ইউরোপের কোন এক রেস্টুরেন্টে সকাল থেকে রাত পরিশ্রম করে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে।

আর এদিকে শান্তির পতাকাবাহীদের কর্মকাণ্ডে তিক্ত হয়ে উদার ইউরোপও অন্যদেশের নাগরিকদের মুখের উপর ‘না’ বলে দিচ্ছে। নিজের দেশে নিরাপত্তা নেই, বাঁচার আশা নিয়ে যেই দেশে এসেছিল, সেখানেও থাকার অনুমতি নেই। অবৈধ হয়ে কতদিন ঘুরে বেড়াবে?

নিলয় নীল মৃত্যুর আগে পুলিশের কাছে গিয়েছিল সাহায্যের জন্য। পুলিশ তাকে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু দেশ ছাড় বললেই তো দেশ ছাড়া যায় না।
একদিকে মৌলবাদী জঙ্গিরা চাপাতি নিয়ে তাড়া করছে, আরেকদিকে সরকার ৫৭ ধারার খড়গ উঁচিয়ে গ্রেফতারের জন্য তাড়া করছে ব্লগারদের। ৫৭ধারাটা আবার শুধু অমুসলিমদের জন্য। শুধু ইসলাম নিয়ে কিছু বললেই গ্রেফতার, কিন্তু মুসলমানরা অমুলিমদের মন্দির মূর্তি ভাঙলে, খুন করলে কেউ গ্রেফতার হয় না। এমনকি খুনিকে হাতে নাতে প্রমাণসহ ধরিয়ে দেয়ার পরেও তাদের বিচার হয় না।

  সেদিন বাংলাদেশের এক পত্রিকায় ব্লগারহত্যা প্রতিরোধে বিশিষ্টজনদের মতামত পড়ছিলাম। তাদের মতে, ব্লগারদের লেখার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী যথাযথ (?) ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই  ব্লগার হত্যা অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হলে তারা মনে করছেন। না, তারা অপরাধীদের আইন অনুযায়ী ‘যথাযথ’ শাস্তির ব্যবস্থার ব্যাপারে কিছু বলেননি। ব্লগাররা হয়তো দেশের এইরকম মাথা বেচা বুদ্ধিজীবিদের মত নয় বলেই তাদের মাথার মূল্য এত বেশি। তাদের মাথায় কোপ দিতে জঙ্গিরা কত নকশা, ছক আঁকে। মাথা বেচাদের মাথার মূল্য নেই বলেই তাদের মাথা নিরাপদ।

ব্লগে লিখে অধিকাংশই মধ্যবিত্ত অথবা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা। উচ্চবিত্তদের দেশ সমাজ এসব নিয়ে না ভাবলেও চলে। আর নিম্নবিত্তরা এসব নিয়ে ভাবার সুযোগ পায় না, তারা প্রতিমুহুর্তে লড়াই করে বাঁচে। আর এই ব্লগাররা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়। তাদের বেশিরভাগেরই সামর্থ্য নেই লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে পাড়ি দেয়ার। ব্লগারদের মৃত্যুর পর, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা তাদেরকে সাহায্য করবে বলে ঘোষণা দিলেও, পরবর্তীতে খুব কমই তা বাস্তবায়িত হয়। হ্যাঁ, হাতে গোনা এক দুইজন হয়তো দেশ ছেড়ে একটি সচ্ছল জীবনের নিশ্চয়তা পেয়েছে। এই সৌভাগ্য তো আর সবার হয় না। দেশে বিদেশে বেশির ভাগ ব্লগারই এখন একটি অনিশ্চিত জীবনযাপন করছে। দেশে যারা আছে তারা মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে চলছে, আর বিদেশে যারা আছে, তারা একটি অচেনা রাস্তায় অনিশ্চিত ভাবে হেঁটে চলছে, জানে না তার ভবিষ্যৎ কি।

অথচ দেশে এদের সবারই একটা নিশ্চিত জীবন ছিল। কেউ লেখাপড়া করছিল, বড় হয়ে বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। কেউ চাকরি করে পরিবার নিয়ে সুখে শান্তিতে ছিল। পত্রিকাওয়ালারা লোমহর্ষক কাহিনী খুঁজে, চ্যানেল ওয়ালারা ব্রেকিং নিউজ খুঁজে। কিন্তু এসব ব্লগারদের কথা কয়জন ভাবে?

লেখালেখির জন্য, আদর্শের জন্য, আমরা কি কম ত্যাগ করেছি? আমার এই মুহূর্তে এইচএসসি পরীক্ষার হলে থাকার কথা। নিয়মিত ফলো করছিল আমাকে, দাঁতে দাঁত চেপে বসেছিলাম, বাবা মা তাদের কাল্পনিক ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিল, মেয়ে যেন অন্তত ইন্টার পরীক্ষাটা দেয়া পর্যন্ত জীবিত থাকে। পরীক্ষা দিয়ে না হয় অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেয়া যাবে। কিন্তু কোথায় পাঠাবে, জানা নেই তাদের। ওই অবস্থায়ও প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম পরীক্ষার জন্য। কিন্তু এরপর যখন শান্তিরদূতেরা দরজায় চাপাতি নিয়ে কড়া নাড়ল, তখন তো আর পরীক্ষার চিন্তা করলে চলে না। অবশেষে দেশ ছাড়লাম, তবে অন্যদেশ যে আমাকে স্বাগত জানাতে বসে আছে তাতো নয়। নিজের দেশে আমার জীবনের নিরাপত্তা নেই। অন্য দেশ কেনও আমাকে আশ্রয় দিবে? এদেশের উপর তো আমার কোন অধিকার নেই। মানবতার খাতিরে ভিসার মেয়াদ বাড়িয়েছে ঠিক, তবে এরপর কি হবে জানা নেই। ইয়ার লস তো হল, এরপরও যে স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া চালিয়ে নেয়া যাবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

আমি হয়তো অন্য ব্লগারদের চেয়ে বয়সে সবচেয়ে ছোট অবস্থায় এইরকম পরিস্থির সম্মুখীন হয়েছি। অন্যদের কথা জানি না। এখনও মাঝেমাঝে অস্থির লাগে, কলেজ জীবনের মজার স্মৃতিগুলো মনে পড়লে। বন্ধুরা ম্যাসেজ করে তাদের কথা জানায়, তারা কি করেছে, কত ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটেছে, শেষ বলে দেয়, ‘তোকে খুব মিস করেছি’, তখন ছুটে চলে যেতে মন চায় দেশে, আমার সেই আনন্দের জগতে। কিন্তু আমি যে একজন ৫৭ ধারার ‘অপরাধী’। সব ধরণের অপরাধীরা সোনার বাংলায় নিরাপদ হলেও ৫৭ ধারার অপরাধীদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা। সেই শাস্তি প্রশাসন দিবে নয়তো শান্তিরদূতেরা। তবে শাস্তি তাদের পেতেই হবে, গ্রন্থের কথা অমান্য করে কি করে!

মঙ্গলবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৬

আমরা হই দাসী, সৌদি ভাবে যৌনদাসী

প্রায় ৮ বছর বন্ধ থাকার পর, ২০১৫ সালে আবার শুরু হয় সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো। গৃহকর্মী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া এসব নারীরা আরবদের নিপীড়নের শিকার হতে পারে, অনেকে এমন আশঙ্কা করলেও বিভিন্ন দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এসব ব্যাপারে তখন আশ্বস্থ করা হয়েছিলো। কিন্তু বাস্তবে এসব আশ্বাস কোন কাজে লাগে নি।
কর্মস্থলে নির্যাতনের কারণে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কা যখন তাদের নারীদের সৌদি আরবে পাঠানো বন্ধ করে দিচ্ছে সেখানে বাংলাদেশ কেন নারী শ্রমিকদের সৌদি আরবে পাঠানো শুরু করে তা আমার কাছে বোধগম্য নয়।
অন্যান্য দেশগুলো নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দেওয়ায়, দেশটি বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মী নিতে আগ্রহী হয়ে উঠে। 

সৌদি সরকার দুই লাখের বেশি নারীকর্মীর চাহিদা জানালে বাংলাদেশ থেকে মাসে দশ হাজার নারীকর্মী পাঠানোর কথা বলা হয়। অথচ ২০১৫ সালের হিসেবে মাত্র ২০ হাজার ৯শ ৫২ জন নারী সৌদি আরবে গিয়েছে। চুক্তির এক বছরে চাহিদার দশ ভাগের একভাগ নারী বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে গেছেন। কাজ করতে যাবার অল্প দিনের মধ্যে আবার নারীদের ফেরত আসার প্রবণতাও দেখা গেছে। 

বাংলাদেশ থেকে পুরুষ কর্মীরা যেখানে টাকা খরচ করে সৌদি যাওয়ার জন্য উদগ্রীব সেখানে বিনা খরচে নারীকর্মীরা কেন আরবে যেতে চান না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইন্টারনেট ঘেঁটে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীদের কি ধরণের অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়, সেসব নিয়ে অনেক তথ্য পেয়ে গেলাম।

সৌদি আরবে বাসার কাজ করে মাসে ১৫-১৬ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব এবং সেখানে নারীরা পর্দার মধ্যে নিরাপদে থাকেন, এ আশ্বাস দিয়ে দরিদ্র অসহায় মেয়েদের সৌদিতে নিয়ে যাওয়া হয়। যাওয়ার পর দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র।
দেশে ধর্ষণ হলেই শোনা যায়, ওই মেয়ের কাপড় ঠিক ছিল না, পর্দা করতো না, তাই ধর্ষণের শিকার হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়, ইসলামী দেশগুলোতে নাকি ধর্ষণ নেই। কারণ তাদের মেয়েরা পর্দা মেনে চলে। সেই পর্দার নিরাপত্তার দোহায় দিয়েই এদেশ থেকে নারী শ্রমিক পাঠানো হয়। শেষ পর্যন্ত, কামুক ধর্ষকদের কাছে পর্দা আর বেপর্দার মধ্যে যে কোন পার্থক্য নেই সেটাই প্রমাণিত হয়, সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের অবস্থা দেখে। বর্বর আরবদের কাছে গরীব দেশ থেকে তাদের দেশে কাজ করতে যাওয়া খেটে খাওয়া নারীরা ভোগ লালসার পণ্য ছাড়া আর কিছু নয়। 
সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের শারীরিক মানসিক নির্যাতন করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, গৃহকর্মীদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়া হয়, তাদের সাথে দেশের স্বজনদের যোগাযোগ করতে দেয় না। 

প্রায় সব নারী শ্রমিকদের একটিই অভিযোগ ‘ধর্ষণ’। তারা ধর্ষণের শিকার হয়, একই পরিবারের পিতা এবং ছেলে দ্বারা। অতিরিক্ত নির্যাতনের শিকার হয়ে তারা নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরে আসেন। দেশে এসে তারা অনেকেই আর স্বাভাবিক হতে পারেন না, কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছিল, নারী কর্মীরা যেন কোনও সমস্যায় না পড়েন, সেদিকে খেয়াল রাখা হবে, এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায়, বিষয়টি যথেষ্ট দুশ্চিন্তার কারণ। কেননা, বেশিরভাগ সময়ই দেখা গেছে, নির্যাতনের শিকার এসব নারীরা দায়িত্বরতদের কাছ থেকে সাহায্য পায় না।

রিয়াদে একটি কোম্পানির কক্ষে আটকে থাকা ২০ থেকে ২৫ জন বাংলাদেশী নারী শ্রমিকের আকুতি, ‘ভাই আমাদের বাঁচান’। অডিওটা শুনে সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের নির্যাতনের চিত্রটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে।
সুন্দরী গৃহকর্মীদের ঘরে আনতে জোর আপত্তি খোদ সৌদি আরবের নারীদের। তাদের অভিমত, বিভিন্ন দেশ থেকে সুন্দরী এবং কমবয়সী নারী গৃহকর্মীরা এসে সংসারের অশান্তি বাড়ায়। তাই সৌদি নারীরা সুন্দরী ও কমবয়সী মেয়েদের গৃহকর্মী করতে চান না।
ভেবে দেখুন সৌদি পুরুষেরা মানসিক ভাবে কতটা অসুস্থ। আমাদের দৃষ্টিতে তারা অসুস্থ হলেও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ। তাদের সুস্থতার রেফারেন্স --
কোরান ৩৩:৫০ ও অহীবাহক, আমরা আপনার জন্য হালাল করেছি(যৌনকর্মে লিপ্ত হতে) আপনার স্ত্রীদের সাথে যাদের মোহরানা আপনি পরিশোধ করেছেন, এবং তাদের(নারী) সাথে যারা আপনার ডান হস্তের অন্তর্গত(দাসী) এবং যারা আপনার যুদ্ধবন্দী যাদেরকে আল্লাহই আপনার প্রতি দিয়েছেন"
কোরান ২৩ আয়াত ৫,৬ 
"তারা যারা অন্যদের সাথে যৌনকর্ম হতে বিরত থাকে শুধু নিজের স্ত্রী,দাসী 
এবং অন্য যাদেরকে তাদের জন্য হালাল করা হয়েছে(যুদ্ধবন্দী) ছাড়া।"
তিনি(নবী মুহাম্মদ) তার(দাসী) সাক্ষাতে গেলেন এবং তাকে হিজাবে থাকতে নির্দেশ দিলেন, অতঃপর তিনি তার সাথে যৌন কর্মে লিপ্ত হলেন কারন সে ছিল তারই সম্পত্তি। -কিতাব আল তাবাক-ত আল-কাবীর ভলুম ৩৯, পৃষ্ঠা ১৯৪
সূরা আল মুমিনূন ২৩: ৬: “তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে (নিজেদের যৌনাঙ্গকে) সংযত না রাখলে তারা তিরস্কৃত হবে না।”
মালিকের মুয়াত্তা হাদিস ২৯.৩২.৯৯:
ইয়াহিয়া—মালিক—দামরা ইবনে সাইদ আল মাজনি—আল হাজ্জাজ ইবনে আমর ইবনে গাজিয়া থেকে: উনি (অর্থাৎ আল হাজ্জাজ) জায়েদ ইবনে সাবিতের সাথে বসে ছিলেন। এই সময় ইয়ামান থেকে ইবনে ফাহদ আসলেন। ইবনে ফাহদ বললেন: “আবু সাইদ! আমার কাছে ক্রীতদাসী আছে। আমার কোন স্ত্রীই এই ক্রীতদাসীদের মত উপভোগ্য নয়। আমার স্ত্রীর কেউই এমন তৃপ্তিদায়ক নয় যে আমি তাদের সাথে সন্তান উৎপাদন করতে চাই। তা হলে কি আমি আমার স্ত্রীদের সাথে আজল করতে পারি?” জায়েদ ইবনে সাবিত উত্তর দিলেন: “হে হাজ্জাজ, আপনি আপনার অভিমত জানান”। আমি (অর্থাৎ হাজ্জাজ) বললাম: “আল্লাহ্‌ আপনাকে ক্ষমা করুন। আমরা আপনার সাথে বসি আপনার কাছে কিছু শিক্ষার জন্যে”। তিনি (অর্থাৎ জায়েদ) বললেন: “আপনার মতামত জানান”। আমি বললাম: “ঐ ক্রীতদাসী হচ্ছে তোমার ময়দান। তুমি চাইলে সেখানে পানি ঢাল অথবা তৃষ্ণার্ত রাখ। আমি এইই শুনেছি জায়েদের কাছ থেকে”। জায়েদ বললেন; “উনি সত্যি বলেছেন”।

সমস্যা হল, এসব বলতে গেলেই অনুভূতিতে আঘাত লেগে যায়। সবচেয়ে বেশি আঘাত লাগে রেফারেন্স দিয়ে কথা বললে। প্রধানমন্ত্রীর মতে নাস্তিকরা পর্ন লিখে, পর্ন তো আসলে দেয়া আছে আপনার পবিত্র গ্রন্থগুলোতে। আমরা শুধু সেসব কপি পেস্ট করি। পবিত্র গ্রন্থগুলো থেকে পবিত্রতার ঢাল উঠিয়ে অন্য যেকোনো বইয়ের মত করে পড়ে দেখুন। তাহলেই বুঝে যাবেন।

এবার শুনেছি নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ থেকে যেসব নারী শ্রমিক যাবে তাদের সঙ্গে একজন পুরুষ নিকটাত্মীয়কে নেবে সৌদি আরব। এই হল বোনাস। নারী শ্রমিক ধর্ষণ করে এবার সাথে একটা করে গেলমান পেয়ে গেলও। বেহেশতে গেলে পাওয়া যাবে- হুরপরী,গেলমান। এই লোভ যাদের মগজে ঢোকানো আছে, তারা পৃথিবীতে হুরপরী-গেলমান পেলে নিজেদেরকে আটকে রাখতে পারবে, এই নিশ্চয়তা কি আপনি দিতে পারেন?
মন্ত্রী বলেছেন, এখন থেকে নারীদের পাঠানোর আগে প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো হবে। দেশে কি প্রশিক্ষণ দেয়া হবে জানি না, তবে উপরে যেই রেফারেন্স দিলাম, সেসবের প্রশিক্ষণ সৌদিরা জন্মগত ভাবেই প্রাপ্ত কাজেই, আপনাদের প্রশিক্ষণ কতটুকু কাজে লাগবে বলার উপায় নেই।

এতকিছুর পরও কেন সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ হচ্ছে না? কেন নিজের দেশেই এসব নারী শ্রমিকদের কর্মস্থানের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না? নারী শ্রমিকদের অত্যাচারের বিনিময়ে কিছু বৈদেশিক মুদ্রা দেশে না এলে কি দেশের অর্থনীতিতে ধ্বস নেমে যাবে?

সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৬

আশায় হতাশায় প্রিয় শাহবাগ

২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবীতে অনলাইন একটিভিস্টরা এই আন্দোলন শুরু করেছিল, দেশের সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনকে সমর্থন করে রাস্তায় নেমেছিল। প্রথমে কেবল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার প্রতিবাদে কুখ্যাত এই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবী নিয়ে মাঠে নামলেও পরবর্তীতে সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি সহ একটি সুন্দর, প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন নিয়ে, দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অন্যায়, মুক্তচিন্তকদের হত্যায়ও গণজাগরণ মঞ্চ সরব থাকে, প্রতিবাদ জানায়।
২০১৩ সালে আমি ক্লাস নাইনের স্টুডেন্ট ছিলাম। শাহবাগের দাবীর সাথে আমি ও আমার বন্ধুরাও একমত ছিলাম। চিটাগাং চেরাগী পাহাড়ের মোড়ে ছিল চট্টগ্রাম গণজাগরণ মঞ্চ। কোচিং ক্লাসের ফাঁকে চলে যেতাম সেখানে, সবার সাথে স্লোগান দিতাম। সে এক অন্যরকম অনুভূতি।
ফেসবুকের কল্যাণে শাহবাগের আন্দোলনের সাথে আরও বেশি জড়িয়ে যাই। ব্লগ সম্পর্কে পরিচিত হয়ে, ছদ্ম নামে লিখা শুরু করি। দেখতাম, বাংলাদেশের তরুণদের এই আন্দোলনকে সমর্থন করে নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিনও তাঁর ফ্রি থট ব্লগে, কলামে, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখতেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সহ আরও নানা অনুষ্ঠানে তিনি শাহবাগ আন্দোলনের পক্ষে কথা বলে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে শাহবাগ আন্দোলনকে আরও পরিচিত করে তোলেন। আদর্শগত কারণে তসলিমা নাসরিন মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন না করলেও শাহবাগকে তিনি মৌলবাদ-ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে মুক্তচিন্তার একটি প্লাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করতেন। শাহবাগের তরুণদের হাতেই বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটবে, মৌলবাদের পতন ঘটবে, এটাই ছিল তাঁর বিশ্বাস।
কিন্তু হায়! সেই শাহবাগও মুক্তচিন্তার পক্ষে পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে লড়াই করে যাওয়া এই লেখকের মতকে সম্মান জানাতে কার্পণ্য করে।
বিভিন্ন সুত্র থেকে শোনা তথ্য অনুযায়ী জানতে পারি, শাহবাগে ২৬শে ফেব্রুয়ারি ‘আলো হাতে আঁধারের যাত্রী’ নামে একটি ডক্যুমেন্টারিটি প্রদর্শনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, কিন্ত শুনেছি গনজাগরণ মঞ্চের কেউ কেউ ওই ডক্যুমেন্টারিটি শাহবাগে প্রদর্শনে আপত্তি জানায়। কেবল তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য ওই ফিল্মে থাকায়, পুরো ফিল্মটি দেখানোর সিদ্ধান্তই বাতিল করে গণজাগরণ মঞ্চ।
৩৩ মিনিটের এই ভিডিওটিতে, নিহত লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বন্যা আহম্মেদ, ব্লগার ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা, ব্লগার আরিফুর রহমান, ব্লগার ওমর ফারুক লুক্স সহ আরও অনেকের বক্তব্য ছিলো। তাদের কাউকে নিয়েই গণজাগরণ মঞ্চের আপত্তি না থাকলেও কেবল তসলিমা নামটি থাকাতেই তারা ফিল্মটি না দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়। গণজাগরণ মঞ্চের এমন আচরণ আমাকে কতটা লজ্জিত আর হতাশ করেছে, তা আমি কয়েকটি শব্দ দিয়ে লিখে বুঝাতে পারব না।
হয়তো শাহবাগের নেতারা ভেবেছেন, শাহবাগে তসলিমা নাসরিন নামটি কোনভাবে উচ্চারিত হলে, মঞ্চের কিছু সমর্থক হারানোর সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু শাহবাগকে কেন সমর্থক হারানোর ভয় নিয়ে চলতে হবে? শাহবাগ তো একটি আদর্শের মঞ্চ, ভোটের রাজনীতি করা কোন আদর্শহীন রাজনৈতিক দল নয়। গণজাগরণ মঞ্চকে যদি সমর্থকের চিন্তা করে তার আদর্শ থেকে সরে আসতে হয় তবে গণজাগরণ মঞ্চ দেশের অন্য কোন মঞ্চ থেকে আলাদা হয় কি করে?
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানে ব্লগার ও অনলাইন একটিভিস্টরা যেসকল বিষয়ে লিখছেন, তার অধিকাংশই তসলিমা নাসরিন আশির দশকে তাঁর বইগুলোতে লিখে রেখেছেন। সেসময় তিনি একাই কলম ধরেছিলেন মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে।
আজকে যদি রাজনৈতিক দলগুলো তসলিমা নাসরিনকে সমর্থন করতো, তবে নিশ্চয়ই গণজাগরণ মঞ্চ 'তসলিমা নাসরিন' নামটি গর্বের সাথে উচ্চারণ করতো। কিন্তু যেহেতু তসলিমা নাসরিনের কোন রাজনৈতিক দল নেই, মৌলবাদী নারীবিরোধীদের বিপক্ষে একাই লড়াই করছেন, তাই মূর্খদের সাথে তাল মিলিয়ে শাহবাগেও ‘তসলিমা’ নামটি নিষিদ্ধ একটি নাম হিসেবেই রয়ে গেলো।
বাংলাদেশের সব পত্রিকা যখন তসলিমা নাসরিনের লেখা ছাপাতে ভয় পেতো, সেই অবস্থায় প্রথম ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ তসলিমা নাসরিনের লেখা ছাপানোর সাহস করে। শুরুতে অনেক হুমকি, গালাগাল পেলেও, এখন অনেকেই লেখকের মতকে সমর্থন করে, লেখকের লেখার প্রশংসা করে চিঠি লেখে।
সাহস নিয়ে শুরুটা করতে পারলেই পরিস্থিতি পাল্টে দেয়া সম্ভব। সেই সাহসটুকু কি তবে আমার প্রিয় মঞ্চটির নেই?
দেশে একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোতে খুব হতাশ হই। মাঝেমাঝে ভাবি, দেশ নিয়ে আমার এত ভাবনা কেন? এতে আদৌ কি কোন লাভ আছে? দেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখার, আশা ভরসার একটিই জায়গা ছিল, তরুণ প্রজন্মের সৃষ্টি, ‘শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর’। এই ভরসার জায়গাটিও কি তবে শেষ পর্যন্ত রইল না?

ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা

১.
কিছুদিন আগে চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, ‘নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি হবে ইসলাম’। মন্ত্রী তার বক্তব্যে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন, তারা বিএনপি জামায়েতের চেয়েও বেশি ধার্মিক। তাদের সরকার মাদ্রাসা (মগজ ধোলায় কারখানা) বানাচ্ছে, মসজিদ তৈরি করছে। কে কার চেয়ে বেশি ধার্মিক সেটা প্রমাণ করতে ব্যস্ত। ভোটের জন্য আওয়ামীলীগ বিএনপি জামায়েতের সাথে ধার্মিক হওয়ার প্রতিযোগীতায় নেমেছে।
বাংলাদেশে ক্লাস ১-১০ পর্যন্ত ধর্ম নামে একটা আবশ্যিক সাবজেক্ট আছে। আগে ধর্ম বই গুলোর নাম ইসলাম ধর্ম, সনাতন ধর্ম থাকলেও কয়েক বছর আগে বই গুলোর নামে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। নাম হয়েছে, ইসলাম ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, সনাতন ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা। সব ধর্মের নামের শেষে নৈতিক শিক্ষা যোগ করা হয়েছে।
‘নৈতিক’ শব্দের অর্থটা নিয়ে আমি কিছুটা বিভ্রান্ত ছিলাম। ডিকশেনারী ঘেঁটে পেলাম, বিশেষ্য 'নীতি'> বিশেষণ 'নৈতিক'> বিশেষ্য 'নৈতিকতা'। নীতি শব্দটি ন্যায়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
প্রশ্ন হল কোনও ধর্ম কি কখনো নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি হতে পারে? অবশ্যই না।
সদা সত্য কথা বললে আল্লাহ্‌ খুশি হবেন, নাস্তিক হত্যা করলেও আল্লাহ্‌ খুশি হবেন। কাজেই সত্য বলাটা নৈতিক হলেও নাস্তিক হত্যা মোটেই নৈতিক কাজ নয়। সুতরাং ধর্মের সাথে নৈতিকতা মিলিয়ে ফেলাটা ঠিক নয়।
ধর্ম মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে, যুদ্ধ-সংঘর্ষের কারণ হতে পারে, বোমা মেরে মানুষ মারার কারণ হতে পারে, চাপাতি দিয়ে নাস্তিক হত্যার শিক্ষা দিতে পারে। কিন্তু নৈতিক শিক্ষা কখনোই দিতে পারে না। নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

২.
আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, আমার খুব প্রিয় একজন বন্ধু ছিল, আমাদের বাসা পাশাপাশি, একসাথে আমরা আর্ট ক্লাসে যেতাম। একদিন আর্ট ক্লাস থেকে ফেরার পথে দেখলাম পাশেই একটা খালি জায়গায় পূজার মণ্ডপের মত বানানো হয়েছে। সেদিন কি যেন একটা পূজা ছিল।
আমি ওই বন্ধুকে বললাম, ‘চল গিয়ে দেখে আসি।’
সে বলল, ‘না, আমি যাবো না’।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’
বলল, ‘আমাদের ধর্মে মূর্তি পূজা হারাম’।
বন্ধু যখন যাচ্ছে না, আমিও আর গেলাম না। কারণ আমি মূর্তি বিশ্বাস করে মূর্তিটা দেখতে চাই নি, ব্যাপারটা কি হচ্ছে, সেটাই দেখতে চেয়েছিলাম।
একদিন আর্ট ক্লাসে স্যার কিছু একটা আঁকতে দিয়েছিলেন, যেখানে কিছু মানুষের ছবি আঁকাতে হবে। আমার বন্ধুটি, রঙে তুলি ডুবিয়ে আঁকতে আঁকতে বলল, জানিস আমাদের কিন্তু মানুষ আঁকা মানা। বললাম, স্যার তো আঁকতে দিলো।
-‘স্যার হিন্দু তাই দিয়েছে।’
‘তাহলে তুই আঁকছিস যে?’
-‘ থাক, আঁকতে ভাল লাগছে, শিশুদের গুণা আল্লাহ্‌ মাফ করে দেয়।’
মাঝেমাঝেই তার সাথে কথা বলার সময় এমন কিছু কথা বলতো যেসবে তাকে আমার খুব অচেনা লাগতো, অপমান বোধ করতাম তার কথা শুনে। ‘তোরা তো হিন্দু, তোরা এটা করিস, সেটা করিস, আমরা ওইসব করি না, গুণা। আমাদের এই নিয়ম, তোদের ওই নিয়ম।’ নিজেকে হিন্দু ভেবে অপমানবোধ করতাম তা নয়, বন্ধু আমাকে হেয় করে দেখছে চিন্তা করেই খারাপ লাগতো। আমাদের মাঝে বন্ধুত্ব টিকে ছিল নিজেদের গুণে। আর আমাদের মধ্যে যা কিছু পার্থক্য, যা কিছু সমস্যা, সেসব হয়েছিল ধর্মের কারণে।
ছোটবেলায় বন্ধুরা হিন্দুদের নিয়ে, হিন্দু ধর্ম নিয়ে আমাকে কিছু বললে আমি বুঝে পেতাম না কেন আমাকে হিন্দু ধর্মের ত্রুটি দেখাচ্ছে ওরা। ওদের কথাবার্তায় মনে হতো হিন্দু ধর্মের ভুল মানে আমার ভুল। বড় হয়ে বন্ধুদের মধ্যে কেউ হিন্দু ধর্মের ভুল ত্রুটি নিয়ে কথা বললে, আমি আরও কিছু যৌক্তিক ভুল ধরিয়ে দিতাম, যেটা আবার তাদের পছন্দ হতো না। কারণ তারা মূলত আমাকে উদ্দেশ্য করেই, আমাকে অপমান করতেই সেসব কথা বলতো। যেহেতু আমি একজন অবিশ্বাসী, কাজেই আমার এতে কিচ্ছু যায় আসে না। কিন্ত আমি যখনই হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি অন্য ধর্ম নিয়ে কিছু বলতে শুরু করতাম তখনই তাদের চেহারা পাল্টে যেতো। একটু আগে তারা হিন্দুদের অযৌক্তিক বিশ্বাস নিয়ে হাসাহাসি করলেও নিজেদের অযৌক্তিক হাস্যকর বিশ্বাসগুলোকে তারা খুব যত্নে লালন করে। তারা অন্যের বিশ্বাস নিয়ে হাসতে পারলেও, তাদের বিশ্বাস নিয়ে কেউ হাসতে পারবে না, এমনই নিয়ম!
স্কুল কলেজে মুসলমান ক্লাসমেটরা তাদের হিন্দু ক্লাসেমেটটিকে ধর্ম প্রসঙ্গ তুলে অপমান করতে পছন্দ করে। আমি অবিশ্বাসী বলে হয়তো এতে আমি অপমানিত হতাম না, কিন্তু অন্য হিন্দুরা কোন উত্তর দিতে পারতো না, নিজের ক্লাসমেটদের কাছে অপমানিত হতো, চুপচাপ সহ্য করতো। বাংলাদেশের একটি রাষ্ট্র ধর্ম আছে, একটি নির্দিষ্ট ধর্মের অনুভূতির প্রতি রাষ্ট্র খুবই যত্নবান। সেখানে অন্যদের চুপ না থেকে উপায় আছে!

৩.
একদিন একজন বলল, ‘তোরা হিন্দুদের তো এক পা ইন্ডিয়ায়, বাংলাদেশে থেকে ইন্ডিয়াকে সাপোর্ট করিস’ এক পা ইন্ডিয়ায় থাকার যথেষ্ট কারণ আছে। কিছুদিন আগে স্লোভাকিয়ায় একজন ইন্ডিয়ান মুসলিম টুরিস্টের সাথে কথা হচ্ছিল। ইন্ডিয়ায় তাদের বাড়ি হিন্দু এলাকায়। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন সমস্যা হয় কিনা। বলল, না, কোন সমস্যা করে না হিন্দুরা। করলে সাথেসাথেই জবাব দিয়ে দেয়া হয়। আর বাংলাদেশে যেকোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে হিন্দু বাড়ি, মন্দির পোড়ানো এখন ডাল-ভাত টাইপ। আর হিন্দু মেয়েরা একটু বড় হলেই বাবা-মায়েরা মেয়েকে মুসলমান ছেলেদের হাত থেকে রক্ষা করতে ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে দেয়, যাদের সামর্থ আছে। এরকম অবস্থায় হিন্দুদের এক পা ইন্ডিয়ায় থাকাটাই স্বাভাবিক। একটি অনলাইন পত্রিকা নিউজে পড়লাম, সেদিন ধর্মশালায় বাংলাদেশ বনাম ন্যাদারল্যান্ডসের খেলায় গ্যালারির এক কর্নারে বসে চোখ মুছছেন এক যুবক! বাংলাদেশের তামিম যখন চার-ছক্কার তুবড়ি ফুটাচ্ছিলেন তখন আনন্দে লাফিয়ে ওঠে যুবক চোখ মোছেন! আবার যখন বাংলাদেশের একের পর এক উইকেটের পতন ঘটছে তখনো তাকে চোখ মুছতে দেখা যায়। এই যুবকের নাম বিক্রম। জন্মেছিলেন বরিশালের উজিরপুরের গ্রামে। তার তিন বছর বয়সে তার পরিবারটি বাংলাদেশ ছেড়ে গিয়ে কলকাতাবাসী হয়।
খুশিতে মাকে জানালো যে সে বাংলাদেশের খেলা দেখছে। মা ছেলের কাছে জানতে চাইলেন, বরিশালের কেউ স্টেডিয়ামে আছে কিনা। এত বছর ইন্ডিয়ায় থেকেও নিজের দেশ বলতে তারা বাংলাদেশকেই বুঝে। ইন্ডিয়ায় এক পা থাকুক কিংবা দুই পা, মন কিন্তু থাকে বাংলাদেশেই।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মুসলমানি

১.
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মুসলমানি কার্যক্রম তো সম্পন্ন হল। মুসলমানি উপলক্ষ্যে ব্লগার বলিও হল। বাকি থাকে শরিয়া আইন কায়েম করা, ৯০% মুসলমানের দেশকে ১০০% মুসলমানের দেশে রূপান্তর করা। ১০% এখন হয় আগা কেটে কনভার্ট হও নতুবা বর্ডার ক্রস করো, তবে গনিমতের মালগুলোকে কোথাও যেতে দেয়া যাবে না। তাদেরকে রেখে দেয়া হবে ইমানদণ্ডের সেবা করার জন্য।
মুসলমানির পর সরকারের মন্ত্রীরা নাকি বলেছেন, দেশের কোথাও সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলে সরকার ঘরে বসে থাকবে না। হ্যাঁ, সরকার ঘরে বসে থাকবে না, সরকারও সংখ্যালঘুদের অত্যাচার নির্যাতন করতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে। এমন সুন্নতী কাজ ফেলে কেউ ঘরে বসে থাকতে পারে?
সামনে পহেলা বৈশাখ। দেশের মুসলমানি যখন হয়ে গেলো ‘পহেলা বৈশাখকে না বলুন’ কর্মসূচীও শুরু করা উচিত। ফেসবুকে এ জাতীয় একটা ইভেন্টও দেখলাম। যদিও মডারেটরা এর ঘোর বিরোধিতা করছেন। এইসব ইভেন্ট নাকি ইসলাম সম্পর্কে মানুষকে ভুল ধারণা দিচ্ছে। মডারেটদের মতে, শফি হুজুররা ইসলামের অপব্যাখা দিচ্ছে, আইসিস-বোকো হারাম-আল কায়দা-হামাস জাতীয় ইসলামী জঙ্গি সংগঠন গুলো ইসলাম সম্পর্কে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। সবাই তো দেখছি ইসলামের অপব্যাখা দিচ্ছে, ইসলাম সম্পর্কে ভুল তথ্য তুলে ধরছে। সঠিকটা তবে কারা তুলে ধরছে? সঠিকটা আসলে কী?

২.
রাষ্ট্র ধর্ম নিয়ে যা কিছু কথাবার্তা প্রতিবাদ তার সবকিছুই হচ্ছে অনলাইনে। অনলাইনের নাস্তিক ব্লগাররা ছাড়া এ নিয়ে কেউ কোন শব্দ করছেন না। এটা আমাকে খুব অবাক করেছে। কয়েকজন সেলেব্রেটি মডারেটের আইডি পেইজ ঘেঁটে দেখলাম তাদের সব কথা তনু হত্যা, তনু ধর্ষণ নিয়ে। রাষ্ট্র ধর্ম নিয় একটি বাক্যও নেই। তনু ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় নি বলেছে এ নিয়ে তারা ক্ষুব্ধ। রাষ্ট্র ধর্ম যেহেতু ইসলাম। আর ইসলামের আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের প্রমাণ হিসেবে চারজন পুরুষ সাক্ষী অথবা ৮ জন নারী সাক্ষী (যেহেতু ইসলামে ১জন পুরুষ=২জন নারী) জোগাড় না করতে পারলে অভিযোগকারীর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। কাজেই তনু ধর্ষণের যেহেতু কোন সাক্ষী পাওয়া যায় নি কাজেই তনুর ধর্ষণ হয় নি। এটা তারা মেনে নিতে চাইছে না কেন?

৩.
‘ধর্মের দোহায় দিয়ে নারীকে দমিয়ে রাখা যাবে না’ এই জোকসটি নাকি নারী দিবসে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার এক বক্তব্যে বলেছেন। জোকস বলছি এই কারনেই, কারণ শরিয়া আইনে নারীর ঘর থেকে বের হওয়াই নিষেধ।
স্বামী তার স্ত্রীকে পবিত্র আইন শিক্ষার জন্য গৃহের বাইরে যাবার অনুমতি দিতে পারবে। সেটা এই কারণে যে যাতে করে স্ত্রী জিকির করতে পারে এবং আল্লাহ্‌র বন্দনা করতে পারে। এই সব ধর্মীয় শিক্ষা লাভের জন্য স্ত্রী প্রয়োজনে তার বান্ধবীর গৃহে অথবা শহরের অন্য স্থানে যেতে পারে। এ ছাড়া স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী কোন ক্রমেই তার মাহরাম (যে পুরুষের সাথে তার বিবাহ সম্ভব নয়, যেমন পিতা, ভ্রাতা, ছেলে…ইত্যাদি) ছাড়া গৃহের বাইরে পা রাখতে পারবে না। শুধু ব্যতিক্রম হবে হজ্জের ক্ষেত্রে, যেখানে এই ভ্রমণ বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া অন্য কোন প্রকার ভ্রমণ স্ত্রীর জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং স্বামীও অনুমতি দিতে পারবে না। --শরিয়া আইন, এম ১০.৩
স্বামীর কর্তব্য হবে স্ত্রীকে গৃহের বাইরে পা না দেবার আদেশ দেওয়া। --শরিয়া আইন, এম ১০.৪
আর নারী নেতৃত্ব তো হারাম আছেই। এখন মডারেটরা সব এসে বলবে, কোথায় ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম বলা হয়েছে? দেখান, ইসলামের অপব্যাখা দিবেন না। এই নিন রেফারেন্স-
সহীহ বুখারী (তাওহীদ) অধ্যায়ঃ ৯২/ ফিতনা, হাদিস নাম্বার:৭০৯৯--আবূ বকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একটি কথা দিয়ে আল্লাহ্ জঙ্গে জামাল (উষ্ট্রের যুদ্ধ) এর সময় আমাকে বড়ই উপকৃত করেছেন। (তা হল) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যখন এ খবর পৌঁছল যে, পারস্যের লোকেরা কিসরার মেয়েকে তাদের শাসক নিযুক্ত করেছে, তখন তিনি বললেনঃ সে জাতি কক্ষনো সফলকাম হবে না, যারা তাদের শাসনভার কোন স্ত্রীলোকের হাতে অর্পণ করে। (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬০৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬১৮)

৪.
কলেজে এক ক্লাসমেট ছিল, কথায় কথায় কোরান হাদিস নিয়ে আসতো। মাদ্রাসা থেকে এসএসসি পাশ করেছে। সে একবার আমাকে বুঝাচ্ছিল, নাস্তিকতা কতটা খারাপ।
‘কোরানে কি নাই? সবকিছুই আছে, তারপরও কেন নাস্তিকরা কোরান মানে না? আল্লাহ্‌ মানে না?’
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কলেজের সব ছেলেদের সাথে তোর যোগাযোগ। তোর এই পোলা নাচানি স্বভাবের ব্যাপারে কোরানে কিছু নাই?
সে তখন বলল, ‘আমরা গুনাহগার বান্দা। গুনাহ করি, আমাদেরও শাস্তি হবে।’
বললাম, ‘তাহলে আমাদের শাস্তির ব্যাপারটাও আল্লাহর হাতে ছেড়ে দে প্লিজ’
নাস্তিকদের শাস্তির ব্যাপারটা মুমিনরা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিচ্ছে না কেন? কারণ আল্লাহ্‌ নিজে নাস্তিকদের কঠোর শাস্তি দিবেন পরকালে। তবে ইহকালে তাদের জন্য কিছু শাস্তির দায়িত্ব তিনি প্রকৃত মুসলমানদের উপর দিয়ে গেছেন। জানি মডারেটগণ মানবেন না। তাই রেফারেন্স হাজির--
আর তাদেরকে হত্যা কর যেখানে পাও সেখানেই। (কোরান ২:১৯১)
খুব শীঘ্রই আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করবো। (কোরান ৩:১৫১)
যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হল তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি। (কোরান ৫:৩৩)
যুদ্ধ কর ওদের সাথে, আল্লাহ তোমাদের হস্তে তাদের শাস্তি দেবেন। তাদের লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের জয়ী করবেন এবং মুসলমানদের অন্তরসমূহ শান্ত করবেন। (কোরান ৯:১৪)
তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবের ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম। (কোরান ৯:২৯)
হে নবী, কাফেরদের সাথে যুদ্ধ (ইংরেজি অনুবাদে - strive hard) করুন এবং মুনাফেকদের সাথে তাদের সাথে কঠোরতা অবলম্বন করুন। (কোরান ৯:৭৩)
হে ঈমানদারগণ, তোমাদের নিকটবর্তী কাফেরদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাও এবং তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করুক আর জেনে রাখ, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন। (কোরান ৯:১২৩)
আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেব। কাজেই গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে কাট জোড়ায় জোড়ায়। (কোরান ৮:১২)

৫.
নাজিমুদ্দিন সামাদ হত্যার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, নাজিমুদ্দিন সামাদ ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর লেখালেখি করতেন কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরও বলেছেন, এভাবে মানুষের ধর্মে আঘাত দেওয়া, বিশ্বাসে আঘাত দেওয়া, পৃথিবীর কোনও দেশেই তা গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যান্য ব্লগার হত্যার পর সাধারণত মন্ত্রীরা বলতেন, তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হবে। যদিও এর কোনকিছুই বাস্তবে ঘটতো না। তবে রাষ্ট্রের মুসলমানি হওয়ার পর মন্ত্রীর কথাও পাল্টে গেলো। মন্ত্রীর কথা অনুযায়ী, নাজিমুদ্দিন কি লিখেছে সেটার উপর নির্ভর করবে তাকে হত্যা করা ঠিক হয়েছে নাকি ভুল।
ব্লগার হত্যা ব্যাপারটা এতদিন থেমে থাকলেও এতদিন পর ঠিক এই সময়েই ব্লগার হত্যার কারণটা কি হতে পারে? রাষ্ট্র ধর্ম, তনু হত্যা, রিজার্ভের টাকা লুট এইসব ইস্যু নিয়ে যখন অনলাইনে ব্লগাররা প্রতিবাদ করছে, এই মুহূর্তে ব্লগারদের লেখার বিষয় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে আরেকজন ব্লগার হত্যা একটি চমৎকার বুদ্ধি নয় কি?
আমারও আগে ভাবতে ভালো লাগতো যে, ব্লগার হত্যাগুলো করছে জামায়েত শিবির। সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে জামায়েত শিবির দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। কিন্তু একের পর এক এতগুলো হত্যার পর কোনরকম পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। বিচারের নাম নেই, ব্লগাররা কি লিখল সেসব খতিয়ে দেখতে ব্যস্ত। এ থেকে বোঝা যায় প্ল্যান শুধুমাত্র জামায়েত শিবিরের নয়। ব্লগার হত্যাগুলো কোনটাই প্রশাসনের অজান্তে ঘটেনি।
ব্লগার-প্রকাশক হত্যাই বুঝিয়ে দিচ্ছে মূর্খরা কলমকে কতটা ভয় পায়। এত কিছুর পরও তাদের অন্ধ বিশ্বাসে আমরা প্রতিনিয়ত আঘাত দিয়ে যাচ্ছি। তাদের বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করছি। মৃত্যু জেনেও করছি। এর কোন তুলনা হয় না।