শনিবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৬

হিন্দুদের পুতুলপূজা এবং মুসলমানদের স্ববিরোধিতা



আমি একজন নাস্তিক। ঈশ্বর নামক কাল্পনিক কিছুতে আমার বিশ্বাস নেই। কাজেই মূর্তিপূজা, ধর্মানুভূতি পূজা এসব আমাকে দিয়ে হয় না। মূর্তিতে যেহেতু আমি কাল্পনিক কোনও শক্তিকে কল্পনা করতে পারি না তাই মূর্তি আমার কাছে শুধুই মূর্তি। পুতুলও বলা যায়। আবার শিল্প হিসেবেও নেয়া যায়। তবে শিল্প যখন সংরক্ষণ না করে পানিতে ভাসানো হয় সেটাকে অর্থ এবং শিল্পের অপচয় বলেই মনে হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যখন সবাই শারদীয় দুর্গা উৎসবের শুভেচ্ছা জানানো চলছে তখন আমি পুতুলখেলা উৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলাম। আগেই বলেছি, আমি মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী নই, আর পুতুল (মূর্তি) নিয়ে যা করা হয় সেটা আমার কাছে পুতুল খেলা উৎসব। এতে অনেকেরই ধর্মানুভূতিতে আঘাত লেগেছে। যদিও এটি রাষ্ট্রধর্মানুভূতি নয় বলে আমাকে ৫৭ ধারা নিয়ে ভাবতে হয়নি। রাষ্ট্রধর্ম ছাড়া বাকি সব ধর্ম নিয়ে যা খুশি বলার চর্চাটা বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে ভালো ভাবেই হয়।

আমার পরিচিত একজন ছোটবেলায় পুতুল নিয়ে খেলা করত। তার পুতুল খেলার বয়স অতিক্রম হওয়ার পরও দেখলাম সে পুতুলের সাথে কথা বলছে, পুতুলটাকে নিজের বোন বলছে। সর্বক্ষণ পাশেপাশে রাখছে। কারও হাত লেগে যেন ব্যথা না পায় সেসব দিকেও তার কড়া নজর। পুতুলকে খাওয়াচ্ছে, পুতুলের সাথে খেলছে, হাসছে, কথা বলছে- এসব দেখে বিভিন্নজনের কি হাসি! হাসি আমারও পেত, তার পুতুলপ্রেম নিয়ে সবসময় তাকে বিরক্ত করতে পছন্দ করতাম। পুতুলের সাথে তার এই অদ্ভুত কাল্পনিক সম্পর্ক দেখে আমি মাঝেমাঝে তাকে অটিস্টিকও মনে করতাম। যদিও এখন তার সেসব কেটে গেছে। তবে সেসময় তার পুতুল প্রেম নিয়ে যারা হাসতেন, ‘এখনও বাচ্চা রয়ে গেছে, পুতুল নিয়ে খেলে’ এরকম ভাব দেখাতেন, তাদের সকলেই সকাল বিকাল মূর্তিকে ফুল বেলপাতা দিয়ে পূজা করে। মূর্তিকে খেতে দেয়। তারপর সেসব খাদ্য পচে অলমোস্ট খাদ্য অযোগ্য হলে সেসবকে ‘প্রসাদ’ বলে ঠাকুরের নাম নিয়ে নমঃ নমঃ বলে খেয়ে ফেলে। ওই পরিচিতের পুতুলপ্রেম নিয়ে হাসাহাসি করলে সে যেভাবে রেগে যেত, বড়দের মূর্তিপূজা নিয়ে হাসলে তারা দ্বিগুণ রেগে যান, সাথে ‘ধর্মানুভূতি’ জাতীয় গুরুগম্ভীর টার্ম যুক্ত হয়। 

ধর্মে আমার বিশ্বাস না থাকলেও সবার নিজ নিজ মত ও বিশ্বাস নিয়ে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অধিকারে আমি বিশ্বাসী। যদিও ধার্মিকদের কাছে ‘আমার ধর্মই একমাত্র সত্য, বাকিসব মিথ্যা’। এটা একদিকে ঠিকই আছে। প্রত্যেক ধর্মের নিয়মকানুনই ভিন্ন এবং কিছু কিছু নিয়ম আবার সাংঘর্ষিকও বটে। যেমন: হিন্দুরা গরুকে তাদের দেবতা রূপে পূজা করে, আর মুসলমানরা কোরবানিতে গরু কেটে উৎসব করে। যে গরুকে দেবতা মনে করে তার গরু কাটা উৎসবে সমর্থন করার কোনও কারণ নেই। প্রধানমন্ত্রী সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, দূর্গাপূজাকে বাঙ্গালীর উৎসব বলেছেন এবং আরও বলেছেন, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। দূর্গাপূজার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় এটি বাঙ্গালীর উৎসবই বটে। ছোটবেলায় ধর্ম বইয়ে পড়তাম, হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব নাকি দূর্গা পূজা। অথচ ইন্ডিয়ায় কলকাতার বাঙ্গালী হিন্দুরা ছাড়া দূর্গা নামটায় কজনে জানে সন্দেহ আছে, আর পূজা বা উৎসব করা তো দূরের কথা। হিন্দু ধর্মে একেক জায়গায় একেক দেব/দেবীর পূজার রীতি প্রচলিত। কোনও জায়গায় ‘দীপাবলী’ সবচেয়ে বড় উৎসব, কোথাও মকর সংক্রান্তি কোথাও শট পূজা। আরও কত যে পূজা। এখন যেমন পূজা বলতে ঐশ্বরিক ব্যাপার ভাবা হয়, মূর্তির ভিতর ঈশ্বর বা অলৌকিকতার গন্ধ খোঁজা হয় প্রাচীনকালে কিন্তু পূজা ব্যাপারটা এমন ছিলও না। তখন সমাজে যারা বিশেষ কোনও অবদান রাখতো তাদেরকে সম্মান জানাতে এই পূজার প্রচলন হয়। কৃষিকাজ আবিষ্কার করে মেয়েরা। আর কৃষি নির্ভর সমাজগুলোতে মেয়েরাই ক্ষমতাবান, তারাই দেবী। পূজাগুলো সাধারণত কৃষিকাজের অবসরে বিনোদনের অংশ ছিল। 

মূর্তিপূজা ইসলাম ধর্মে হারাম। ইসলাম ধর্মের শুরুটাই হয়েছিল নবী মুহাম্মদের কুরাইশদের ৩৬০টি মূর্তি ভাঙার মধ্য দিয়ে। ইসলাম ধর্মে পাপীদের জন্য সাতটি দোযখ বরাদ্ধ রাখা আছে বলে বিশ্বাস করা হয়। তারমধ্যে তিন নম্বর দোযখটির নাম হল ‘ছাক্কার’। দেব দেবী ও মূর্তির উপাসকদের এই দোযখে পাঠানো হবে। 

কোরআন শরীফ, হাদিস শরীফ, ইজমা ও কিয়াস অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকীদা মোতাবেক প্রাণীর ছবি তৈরি করা, তোলা, তোলানো, আঁকা, রাখা, দেখা, দেখানো ইত্যাদি হারাম ও নাযায়িজ। হাশরের ময়দানে যারা মূর্তি তৈরি করেছেন, প্রাণীর ছবি এঁকেছেন তাদেরকে নিজেদের তৈরি মূর্তি/ছবি’তে প্রাণ সৃষ্টি করতে বলা হবে। আর তারা যখন তা পারবেন না, তখন তাদেরকে ‘ছক্কারে’ পাঠিয়ে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। এ বিষয়ে কিছু হাদিস -


عن ابى معاوية رضى الله تعالى عنه ان من اشد اهل النار يوم القيمة عذابا المصورون.

অর্থ: হযরত আবূ মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত, “নিশ্চয় ক্বিয়ামতের দিন দোযখবাসীদের মধ্যে ঐ ব্যক্তির কঠিন আজাব হবে, যে ব্যক্তি প্রাণীর ছবি আঁকে বা তোলে।” (মুসলিম শরীফ ২য় জি: পৃঃ ২০১)


عن جابر رضى الله تعالى عنه قال نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن الصورة فى البيت ونهى ان يصنع

ذلك.

অর্থ: হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ঘরের মধ্যে প্রাণীর ছবি রাখতে নিষেধ করেছেন এবং ওটা তৈরি করতেও নিষেধ করেছেন। (তিরমিযি ১ম জি: পৃঃ ২০৭)

عن ابن مسعود قال اشد الناس عذابا يوم القيامة رجل قتل نبيا او قتله نبى او رجل يضل الناس بغير العلم او مصور يصور التماثيل.

অর্থ: হযরত ইবনে মাস্উদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে ঐ ব্যক্তিদের ক্বিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি হবে, যারা কোন নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে শহীদ করেছে অথবা কোন নবী আলাইহিমুস সালাম যাদেরকে হত্যা করেছেন এবং ঐ সমস্ত লোক যারা বিনা ইলমে মানুষদেরকে গোমরাহ করে এবং যারা প্রাণীর ছবি তৈরি করে। (মুসনদে আহমদ ২য় জি: পৃঃ২১৭)


আমার পরিচিত অনেককেই দেখলাম মূর্তি পূজা বিষয়ে অন্য মুসলমানদের সচেতন করছেন। যদিও তারা নিজেরা ছবি আঁকেন, তুলেন এবং নিয়মিত ফেসবুকে আপলোড দেন, প্রেমট্রেমও করেন। আমি তাদেরকে নিজেদের এসব গুনার কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। কারণ এসব কাজের জন্যও ওই একই শাস্তি বরাদ্ধ করা আছে। 

আর যারা বলছেন, ইসলামে মূর্তিভাঙ্গার কথা উল্লেখ নেই তারা স্পষ্টভাবে ইসলাম নিয়ে মিথ্যাচার করছেন। কারণ
সহীহ্‌ মুসলিম, হাদিয়াত ৯৬৯ এ আছে, আবুল হাইয়াজ আসাদী বলেন, আলী ইবনে আবী তালেব (রা.) আমাকে বললেন, “আমি কি তোমাকে ওই কাজের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করব না, যে কাজের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে প্রেরণ করেছিলেন? তা এই যে, তুমি সকল মূর্তি বিলুপ্ত করবে এবং সকল সমাধি-সৌধ ভূমিসাৎ করে দিবে এবং সকল চিত্র মুছে ফেলবে”।

সিলেটে হেফাজতে ইসলাম কর্তৃক শহীদ মিনারের ওপর আঘাত আসার কারণও আশা করি স্পষ্ট হয়েছে। ইসলামিক বিধি মেনে চললে শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, বঙ্গবন্ধুর মূর্তি, মুক্তিযুদ্ধের স্থাপত্য সহ সকল মূর্তি ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া উচিত। এইজন্যই ইসলামিক স্টেট ক্বাবা শরীফ ভেঙে ফেলার কথা বলেছে। ক্বাবা শরীফকে কেন্দ্র করে হাঁটা, একবার ছুঁয়ে দেখা, চুমু খাওয়া, শয়তানকে পাথর ছুঁড়ে মারা এগুলোও তো একরকমের মূর্তিপূজা। 

শুনেছি হজ্বের সময় এখন মানুষকে ছবি ভিডিও সেলফি তুলতে দেখা যায়। এছাড়া হ্বজের সময় সেখানে নাকি অসংখ্য সিসিটিভি লাগানো হয়! অথচ ইসলামে কিন্তু এ সম্পর্কে কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে।

‘ধর্ম যার যার উৎসব তার তার’ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের কড়া নিন্দা করেছেন বাংলার জনপ্রিয় হুজুর আল্লামা আহম্মেদ শফি। মডারেটরা হয়তো বলবেন শফী হুজুর সমগ্র বাংলাদেশের ধর্মপ্রান উদার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না। যদিও এই শফি হুজুরের ডাকেই লাখ লাখ মানুষের জমায়েত হয়। এমনকি মডারেটরাও ‘যদিও /কিন্ত’ জাতীয় সুর তুলে সময়ে শফি হুজুরের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। নায়ক আলমগীর বলেছেন, ‘ধর্ম যার, উৎসবও তার’। তারমতে সহি ইসলামে অন্য ধর্মের কোনও অনুষ্ঠানে মুসলমানদের যোগ দেয়া ইসলামবিরোধী। যদিও তিনি ঠিক কথা বলছেন, তবে সারাজীবন তিনি যা করে এসেছেন টিভির পর্দায় নায়িকাদের সাথে, তাতে তিনি এরচেয়েও অনেক বড় ইসলাম বিরোধী কাজ করে গেছেন। হারামকাজ করে টাকার পাহাড় বানিয়ে এখন তিনি এসেছেন সহি ইসলামিক জ্ঞান দিতে। ভণ্ডামি আর কাকে বলে!

জার জন্য দেখলাম সরকারি ভাবে বেশ কিছু নিয়ম নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। এসকল নিয়ম মেনেই সবসময় পূজা হয়ে আসছে। নামাজের সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে পুজা করার ফলাফল এদেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকেরা ভালোই জানে। তারপরও সেসব নিয়মগুলোকে সরকারিভাবে উল্লেখ করে দেয়া, পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই নির্দেশ করে। 

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তও চিরস্থায়ী নয়। যুগের সাথে তাল মিলাতে গেলে বদলাতে হয়। সেখানে ধর্মগুলোর চিরস্থায়ী নিয়মগুলো সবাই নিজের সুবিধা মত ব্যবহার করছে। এটা হিপোক্রেসি তো অবশ্যই। এই হিপোক্রেসির বিরুদ্ধে বললেও নাকি ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে! নাস্তিক মানেই কেউ ভালো মানুষ, মানবিক, সমানাধিকারে বিশ্বাসী এমন ভাবাটা খুব ভুল। নাস্তিকতা মানে ঈশ্বরে অবিশ্বাস। অনেকে আছেন, জন্মগত ভাবে পারিবারিক ধর্ম পালন করেন। তবে নিয়ম পালনের তোয়াক্কা করেন না। সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডকে ঘৃণা করেন। আস্তিক হয়েও অনেকে অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতার চর্চা করেন। এটি অবশ্যই ভালো লক্ষণ। এর পেছনে কিন্তু ব্যক্তির ধর্মের কোনও হাত নেই। এটি সম্পূর্ণই ব্যক্তির নৈতিকতার উপর নির্ভর করে। ধর্ম বলতে অনেকে নৈতিক শিক্ষাকে বুঝেন। নৈতিকতার সাথে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। ভালো মানুষ হতে ধার্মিক হওয়া জরুরী নয়। ধর্ম পালন না করেও মানবিক গুণাবলীর চর্চা করা যায়। বরং সেক্ষেত্রে কোনও ধরণের হিপোক্রেসি করতে হয় না।

সোমবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

চুল সমাচার

অনেকদিন পর লিখতে বসেছি। নতুন স্কুলে ভর্তি হলাম, মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগছে, তাই লেখার সময় হয়ে উঠছিল না। চুল লম্বা হয়ে গেছে, কাটানোর সময় পাচ্ছিলাম না। দুদিন ছুটি পাওয়াতে আজ গিয়েছিলাম চুল কাটাতে। চুল কাটানো নিয়ে আমার জীবনে অনেক ধরণের অভিজ্ঞতা হয়েছে। দেশে ছোটবেলা বাবার সাথে যেতাম সেলুনে চুল কাটাতে। একটু বড় হতেই জানতে পারলাম সেলুনে যেহেতু পুরুষ নাপিত থাকে কাজেই আমার সেলুনে চুল কাটা চলবে না। পুরুষ নাপিত একজন মেয়ের চুল কাটছে, ব্যাপারটা আমার ‘অতি উন্নত’ সমাজ ভালোভাবে নেয় না। কিন্তু আমার চুলের কাট তো পার্লারের মেয়েরা জানে না। একজনকে দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করাতে পার্লারে নিয়ে আমি নির্দেশনা দিয়ে তার চুল কাটালাম। উদ্দেশ্য, তারটা যদি ঠিকভাবে কেটে দিতে পারে তবে আমিও কাটাতে বসব। কিন্তু না, পার্লারে আমি যেমনটা চাচ্ছিলাম সেভাবে কাটতে পারলো না। তাই আমি সেই সেলুনেই ফিরে গেলাম। সেলুনের নাপিতেরা আমাকে ছেলে হিসেবে নিয়ে চুল কাটতো। কারও কোনও সমস্যা হতো না।
আজকে একটা ইন্ডিয়ান সেলুনে গিয়েছিলাম চুল কাটাতে। এখানে চুল কাটার দাম অনেক। একটু কম দামে কাটতেই মূলত ইন্ডিয়ান সেলুনে যাওয়া। এখানে ছেলে মেয়ে সবাই চুল কাটাচ্ছে। ছেলে নাপিত যেমন আছে, মেয়ে নাপিতও আছে। ছেলের চুল মেয়ে কাটছে, মেয়ের চুল ছেলে। এতে কারও কোন সমস্যা হচ্ছে না।
আমার চুল যে কাটলো সে জানে আমি মেয়ে। বয় কাট দিতে বললাম। দিলো। বয় কাটের দামটা অন্যগুলোর তুলনায় কম আর মেয়েদের জন্য কিছু কাটের নাম দেখলাম, সেসব অনেক টাকার। কাটানো শেষে বিল দিতে গিয়ে হঠাৎ ক্যাশিয়ারের মনে হল আমি মেয়ে। পরমূহুর্তেই সে আমার কাছ থেকে বয় কাটের তিনগুন দাম চাইল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘বয় কাটের দাম তো এত না, আপনি তো একটু আগেই সেই দাম নিচ্ছিলেন। এখন আবার তিন গুন দাম চাইছেন কেনও?’ সে বলল ‘ওটা তো ছেলেদের জন্য। মেয়েদের জন্য অন্য দাম।’ বললাম, ‘দাম তো নির্দিষ্ট হবে। একই কাট ছেলের মাথায় হলে এক দাম, মেয়ের মাথা হলে অন্য দাম কেনও হবে? আপনারা তো কাটের দাম নিবেন, আমি ছেলে নাকি মেয়ে তাতে আপনাদের কী আসে যায়?’ জানালো, এটাই নাকি তাদের নিয়ম। বললাম, ‘এই কাট যদি কোন ট্রান্স জেন্ডারের মাথায় যায় তাহলে কোন দাম দিয়ে তার মাথা ভেঙে খাবেন সেটা তো লিখেন নি’। তারপর সে বলল, ট্রান্সজেন্ডার নাকি মানুষের মনের ভুল। একজন হ্যান্ডসাম,শিক্ষিত লোকের মুখে একথা শুনে তো আমি অবাক! তাকে জানালাম, সে যেই দেশে বসবাস করছে এখানে ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকারের পক্ষে আইন রয়েছে। এমনকি তার নিজের দেশ ইন্ডিয়াতেও ট্রান্সজেন্ডারদের বৈধতা দেয়া হয়েছে। কোনও উত্তর খুঁজে না পেয়ে বলল, তাদের নিয়মই এটা। নিয়মের বাইরে সে যেতে পারবে না। নিয়ম চেইঞ্জ করার পরামর্শ দিয়ে বেরিয়ে এলাম।
প্রথমত, একই কাট ছেলের মাথায় দিলে এক দাম, মেয়ের মাথায় সেটার তিনগুন দাম কীভাবে হয় সেটা আমার কোনও ভাবেই বোধগম্য হলও না। আর দ্বিতীয়্ত, ওই সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত লোকের মুখে ট্রান্সজেন্ডারের সংজ্ঞা শুনে আমাদের সমাজের অধিকাংশের মানসিকতা আসলে কেমন, সেটা বুঝলাম।
আমার ছোট চুল নিয়ে আমি যথেষ্ঠ স্বাচ্ছেন্দ্যে থাকলেও আমার আশেপাশের মানুষ প্রতিনিয়ত আমার ছোট চুলের ব্যাপারে তাদের ঘোর আপত্তি প্রকাশ করতো। বলতো, এমন ছোট চুল রাখলে আমার ক্লাসে ছেলেরা আমাকে পছন্দ করবে না। নিজেকে অস্বস্তিতে রেখে অন্যের চোখে সুন্দর হওয়ার কাজটা আমার দ্বারা কখনোই হয়ে উঠে নি। বিশাল চুলের যত্ন করার সময় ও ইচ্ছে কোনটাই আমার নেই। আর কারও চোখের সুখের জন্য আমি আমার মাথাকে উকুনের আবাস ভূমি বানাতে রাজি না।
অন্যের কাছে ভালো মেয়ে খেতাব পেতে আমাদের দেশের মেয়েরা প্রচন্ড গরমেও মাথায় কাপড়ের পাহাড় বানিয়ে চুল ঢাকছে, বোরখা পরছে। নিজের স্বাচ্ছন্দ্য অনুভবের বিষয়টি সম্পর্কেই তাদের ধারণা নেই। একটিই জীবন, সেটাই কাটিয়ে দিচ্ছে অন্যের ইচ্ছেকে মেনে নিয়ে, নিজে কষ্টে থেকে অন্যকে সুখী করে। সমাজে ‘ভালো মেয়ে’ হওয়াটা জরুরী কিনা!

বুক নিয়ে লজ্জা!



বুক নিয়ে লিখেছিলাম মাসখানেক আগে। মেয়েদের বুক নিয়ে কিসের এত লজ্জা, কী কারণে এ লজ্জা- এসব প্রশ্ন প্রায় আমার মাথায় ঘুরপাক খায়।

একবার কোচিং ক্লাসে কারেন্ট ছিলও না, আইপিএস নষ্ট হয়ে গেছে। প্রচন্ড গরমে ক্লাস করছি। ছেলেরা শার্টের বোতাম খুলে বসেছে। অন্যদিকে মেয়েরা সেলোয়ার কামিজ, ওড়না, হিজাব আরও ভালোভাবে পেঁচিয়ে বসেছে। কারণ ঘামে ভিজে যদি ভিতরের কিছু দেখা যায়! আমি শার্টের একটা বোতাম খুলে বসলাম দেখে স্যার জিজ্ঞেস করলেন, কী ইতু? খুব গরম লাগছে নাকি? আমি আরও দুটো বোতাম খুলতে খুলতে উত্তর দিলাম, ‘হ্যাঁ স্যার’। হয়তো ভেবেছিলেন, আমি স্যারের প্রশ্নে বিব্রত হয়ে বোতামটা লাগিয়ে নিবো। কিন্তু উল্টো আমাকে আরও দুটো বোতাম খুলতে দেখে স্যার-ই মনে হয় খানিকটা বিব্রত হয়েছিলেন।

আমি আমার শরীর নিয়ে একটুও লজ্জিত নই। ছেলে এবং মেয়ে বেড়ে উঠতে থাকলে ছেলেটির স্বাধীনতা বাড়তে থাকে, আর মেয়েটির কমতে থাকে। মেয়েটির স্বাধীনতা কমে মেয়েটির শরীরের কারণে। শরীর নিয়ে ভয়। এই বুঝি কেউ দেখে ফেলল, বাজে ইঙ্গিত করল, ধর্ষন করতে এলো। আমি ভেবে পাই না সারাক্ষণ এসব চিন্তা মাথায় নিয়ে মেয়েরা বাঁচে কীভাবে?

অনেকের কাছে শুনি, নারী স্বাধীনতা মানেই কি শরীরের স্বাধীনতা? অর্থনৈতিক স্বাধীনতা চাও, শিক্ষার অধিকার চাও ঠিক আছে। কিন্তু শরীরের স্বাধীনতা চেও না। শরীরটা পুরুষের কাছে বন্ধক রেখে বাকি স্বাধীনতা চাও। কিন্তু আমার মতে নারী যতদিন নিজের শরীরকে পুরুষতান্ত্রিক শেকল থেকে মুক্ত করতে না পারছে, ততদিন নারীর কোনও স্বাধীনতাই আসবে না। ধরুন, একজন শিক্ষিত মেয়ে। অর্থনৈতিক ভাবে স্বাধীন। সেও কিন্তু রাতের অন্ধকারে, ভীড়ের মাঝে পুরুষের নষ্ট মানসিকতা থেকে রক্ষা পায় না। ওই সচ্ছল মেয়েটিও ধর্ষনের শিকার হলে তার অন্যসব পরিচয় মুছে গিয়ে তার পরিচয় হবে ‘একজন ধর্ষিতা’। আর যতদিন পুরুষ নারীর শরীরকে নিজেদের সম্পত্তি বলে মনে করছে ততদিন এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

আমি বাসায় গরমকালে সেন্ডোগেঞ্জি পরি। ছোটবেলায় এটা নিয়ে কারও আপত্তি না থাকলেও ধীরে ধীরে পরিবারের সবার আপত্তি শুরু হল। এই পোশাক পরে দরজা খুলতে যাবে না। একদিন বাসায় এক আত্মীয় এলে আমাকে বলা হল, ‘যাও গিয়ে নমস্কার করে এসো’। আমি তো আমার পোশাকেই রওনা হলাম। মা থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘উপরে কিছু একটা পরে নাও’। আমি রেগে গিয়ে বললাম, ‘যেই লোকের আমাকে সেন্ডো গেঞ্জি পরা অবস্থায় দেখলে মাথায় বদ মতলব আসতে পারে বলে তোমার মনে হয় তাকে আমি নমস্কার করতে যাবো? অসম্ভব’।

একদিন মা বললেন, ‘তুমি এখন বড় হচ্ছো, তোমার বাবার সামনে এধরণের পোশাক পরে চলা ঠিক না’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা কি মাঝেমাঝে ভুলে যান যে আমি তার সম্পর্কে মেয়ে হই?’ এরপর থেকে মা আমাকে এসব বিষয় নিয়ে কিছু বলতে কিছুটা ভয় পেতেন সম্ভবত। কারণ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমাকে দিয়ে কোন কিছু করাতে বাধ্য করা সম্ভব নয়। আর প্রশ্নের কোনও উত্তর দেয়াও সম্ভব নয়।

আমার ছোট বোনকেও আস্তে আস্তে ঢেকে চলার পরামর্শ দেয়া শুরু হল। মা’র খুব চিন্তা, বড় বোনের কাছ থেকে শিখে যদি ছোটজনও নষ্ট হয়ে যায়। ছোটবোনকে মা ঢেকে চলার উপদেশ দিতে গেলেই সে আমাকে ডাকতো। আর আমাকে ডাকা মানেই প্রশ্ন। কার জন্য আমাকে ঢাকতে হবে? তার কী কী সমস্যা হয়? তার সমস্যার জন্য আমাকে কেন কাপড়ের বস্তা জড়াতে হবে? মেয়েরা যদি এখন থেকে ছেলেদের ঠোঁট বুক কোমরের দিকে অস্বাভাবিক ভাবে তাকিয়ে থাকে, তবে ছেলেরাও কি বোরখা হিজাব জাতীয় ঢেকে রাখা পোশাক পরবে? নাকি নিজেকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করতে ব্যস্ত হবে?

যেসব মেয়েরা নিজের শরীর নিয়ে অত্যন্ত লজ্জিত, তারা কি একবার এসব প্রশ্ন ভেবে দেখবেন? যারা আপনাকে কাপড়ের বস্তা পেঁচাতে বাধ্য করে তাদের কাছ থেকে একবার এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইবেন?

অলম্পিকের ভারতীয় প্রতিযোগী দীপা কর্মকারের ছবি দিয়ে এক বাংলাদেশী মুসলমান ছেলে পোস্ট দিয়েছে, দীপা নাকি অশ্লীল সব ড্রেস পরে খেলছে। একজন বাঙালি হিসেবে ব্যাপারটা নাকি সে মেনে নিতে পারছে না, সে বাঙালি হিসেবে লজ্জা পাচ্ছে। সাধারণত এদেশীয় মুসলমানরা মনে করে, তারা আগে মুসলমান পরে বাঙালি। এখানে মেয়েটির ড্রেস নিয়ে দুটো জ্ঞানের বাণী শোনাতে নিজের মুসলমান পরিচয়কে পিছনে রেখে বাঙালি পরিচয় নিয়ে হাজির হয়েছেন ওই অসভ্য মালটি।

ফেসবুকে একজন প্র্যাগনেন্ট নারী তার পেটের ছবি দিয়ে জানিয়েছেন, ‘সাত মাস চলছে’। ছবির কমেন্টে দেখলাম ওই নারীকে গালাগাল দিচ্ছে, ছবি সরিয়ে নিতে বলছে। ছবিটি নাকি অত্যন্ত অশ্লীল। বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে এমন ছবিও নাকি ভয়ংকর অশ্লীল। যাদের চিন্তাচেতনা অন্ডকোষ দিয়ে পরিচালিত মস্তিষ্ক দিয়ে নয়, তারা সব কিছুতেই অশ্লীলতা খুঁজে পাবেন। স্বাভাবিক।

কিন্তু কোনও অসুস্থ চিন্তা চেতনার মানুষের ভয়ে কেন আমি নিজেকে অস্বস্তিতে রেখে শরীরে কাপড়ের পাহাড় জড়াব? বুক ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখা, মাথা কাপড়ের বস্তা দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা, কাপড়ের উপর আবার বোরখা পরে পুরা শরীর ঢাকা। এত ঢাকাঢাকির কারণ আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না।

দেশে হিজাবের পরিমাণ বাড়ছে। হিজাব যেন একটি সংক্রামক ব্যাধি। একজন পরলে তার কাছ থেকে শিখে আরেকজন পরছে। এখন নাকি বোরখা নামক ব্যাধিতেও আক্রান্ত হচ্ছে দেশের মেয়েরা। হিজাব যদি সংক্রামক হয়, তবে নিজের শরীর নিয়ে লজ্জা না থাকা কোনও মেয়ে যদি তার ব্রা পরা ছবিটি প্রকাশ করে তবে কি অন্য মেয়েরাও এতে সাহস পাবে? এটিও সংক্রামক হবে? লজ্জা ভাঙবে? হয়তো কেউ কেউ সাহস পাবে, নিজের শরীর নিয়ে আর লজ্জিত হবে না। যদিও ‘ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়’ তবুও মেয়েরা আর নিজের শরীর নিয়ে লজ্জিত হচ্ছে না, ভয় পাচ্ছে না, স্বাধীন জীবন উপভোগ করছে এমন একটি সুন্দর সমাজের স্বপ্ন আমি সবসময় দেখি।

পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়েছি, ধর্মান্ধতা থেকে নয়

প্রতিবার যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকরের পর ফাঁসির পক্ষে বিপক্ষে মতভেদের সৃষ্টি হয়। যারা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির বিপক্ষে তবে নাস্তিকদের ফাঁসি-কতল চান তাদের কথা বলছি না। যারা মানবতাবাদী, যারা মনে করেন প্রত্যেক মানুষের বাঁচার অধিকার আছে আমি তাদের কথা বলছি।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে এ নিয়ে কম আলোচনা তর্ক বিতর্ক হয় নি। এমনই এক আলোচনায় একজন বলছিলেন, ‘এখন যদি বাংলাদেশ রাষ্ট্র থেকে চট্টগ্রাম মুক্ত হয়ে নিজেদের স্বাধীনতা চায় তবে তুমি কি এর পক্ষে থাকবে নাকি বিপক্ষে?’
বললাম, ‘বিপক্ষে’।
‘ঠিক একই অপরাধটাই করেছিল ৭১ সালে জামায়েত শিবিরের নেতারা। তারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল, তাই আজকে আওয়ামীলীগ এটাতে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে তাদেরকে ফাঁসি দিচ্ছে।’
আমি সাথে সাথে আপত্তি জানালাম। তাকে জানালাম যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা না চাওয়ার জন্য তাদেরকে ফাঁসি দেয়া হচ্ছে না। ৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে তারা নিরীহ বাঙালীদের উপর যে বর্বরতা করেছে, তাদের সেসকল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হচ্ছে।

এসব যুদ্ধাপরাধীরা কেবল ৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেই ক্ষান্ত হয় নি। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে দেশে এসে মেজর জিয়ার শাসনামলে পুনর্বাসিত হয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস না করে স্বাধীন দেশে তারা দেশবিরোধী রাজনীতি করেছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর আশ্রয়ে, ধর্মভীরু জনগণের সহানুভূতি’কে কাজে লাগিয়ে তারা আজ অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবে যথেষ্ট পরিমাণ শক্তিশালী। তারা তাদের মৃত্যুকে শহীদি মৃত্যু বলে ঘোষণা দিলেও ফাঁসি থেকে বাঁচতে কিন্তু কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেছে। শেষপর্যন্ত ফাঁসি আটকাতে না পেরে শহীদি মৃত্যুর সান্ত্বনা নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় হয়েছে। তারা মনে করে, ৭১এর মুক্তিযুদ্ধে তারা ইসলাম রক্ষার জন্য গণহত্যা করেছে। একইভাবে বর্তমানে তাদের ফাঁসিকে তারা ইসলামের জন্য মৃত্যু বলেই মনে করে।

যদিও আমি মনে করি প্রত্যেক মানুষেরই বাঁচার অধিকার আছে, অপরাধী অনুতপ্ত হলে তার সাজা কমিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু এ মৃত্যুতে আমি কোনোভাবেই দুঃখিত নই। এসকল অপরাধীরা মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তাদের অপরাধ স্বীকার করে নি, তাদের কৃত কর্মের জন্য তারা মোটেই অনুতপ্ত নয়। মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও কাদের মোল্লা‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে গেছে। কামারুজ্জামানের মৃত্যুর পর তার পরিবার মিডিয়ায় ‘ভি’ চিহ্ন প্রদর্শন করেছে। সাকা-মুজাহিদ ক্ষমা চাওয়ার নাটক করে একদিন বেশি বাঁচার আশা করেছিল। কিন্তু যখন দেখল এতে কাজ হচ্ছে না, তখন তার পরিবারের সদস্যরা বাইরে এসে জানিয়ে দিলো তাদের বাবা ক্ষমা চায় নি। এসব ভয়ংকর অপরাধীদের যদি কোনোভাবে ক্ষমা করা হয় তবে ভবিষ্যতে সরকার বদলের পরই তারা জেল থেকে মুক্ত হয়ে হয়তো ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক সদস্যকে হত্যা করবে। বিচার চলাকালীনই কিছু সাক্ষীকে হত্যা করা হয়েছে, আহত করা হয়েছে। কাজেই যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি মানবতা দেখানোর কোনও কারণ আমি খুঁজে পাই না।
তবে প্রশ্ন হল, এই কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দিলেই কি দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? জঙ্গিবাদ নির্মূল হবে? জামায়েত নিষিদ্ধ হলেই কি দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চিরতরে মুছে যাবে? না।

কিছুদিন আগে ইউটিউবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি টেলিফিল্ম দেখছিলাম। এটাকে টেলিফিল্ম না বলে ডকুমেন্টারি ফিল্মও বলা যায়। কারিগর নামে পরিচিত এক লোক তার গ্রামে মুসলিম ছেলেদের মুসলমানি করাতেন। ৭১এ গ্রামে গ্রামে যখন হিন্দুদের হত্যা করা হচ্ছিল, তখন কারিগর ও তার স্ত্রী মিলে একটি বুদ্ধি বের করলেন। তারা রাত জেগে সকল হিন্দুদের একটি মুসলিম নাম বানিয়ে লিস্ট করলেন। পাকিস্তানি মিলিটারি এলে কারিগর তাদেরকে লিস্টটি দিয়ে জানালেন এরা সবাই মুসলিম, তিনি নিজে এদের মুসলমানি করিয়েছেন। কথার সত্যতা যাচাই করতে মিলিটারিরা তাঁকে কোরান মাথায় নিয়ে একথা বলতে বলল। তিনি বললেন। ওই গ্রামের অনেক হিন্দুই নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কোরান মাথায় নিয়ে মিথ্যে বলার কারণে তাঁকে এক ঘরে করা হয়। স্বাধীন দেশে বিচার বসিয়ে তাঁকে অপমানিত করা হয়। আসলে আমরা পাকিস্তান থেকে মুক্ত হলেও সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা থেকে মুক্ত হতে পারে নি।

৪৪ বছর ধরে যেই জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িক বীজ বপন করা হয়েছে তা এত সহজে দমন হওয়ার নয়। মুক্তমনা, সংখ্যালঘুদের হত্যার পর সরকারের ভূমিকায় আমি হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু গুলশানের ঘটনার পর জঙ্গি দমনে সরকারের ভূমিকা কিছুটা আশা জাগিয়েছে। যদিও জানি যে আবার একজন মুক্তমনাকে হত্যা করা হলে নির্লজ্জ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিহতের লেখা খতিয়ে দেখার বিষয়কে গুরুত্ব দিবেন। হাসিনা জানাবেন, লেখার কারণে মেরে ফেললে তার সরকার এর দায় নিতে পারবে না। ঠিক এ কারণেই স্বাধীন দেশে যুদ্ধাপরাধীরা রাজনীতি করার সাহস পেয়েছিল। আমাদের সমস্যা হল, আমরা এক পা এগিয়ে গেলে আবার তিন পা পিছিয়ে যাই।

দেশ নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখতে চাই, স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। তাই যুদ্ধাপরাধীদের রায় কার্যকরে সরকারের সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করার পাশাপাশি সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের দাবী জানাই, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক, মুক্তমনা-সংখ্যালঘু হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হোক, ভিন্নমতের মানুষেরাও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার পাক।

মেয়েদের ফুটবল নাকি মেয়েরাই ফুটবল?

দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনা নারী ফুটবলারদের লোকাল বাসে কুরুচিকর মন্তব্যের মুখোমুখি হওয়া নিয়ে চারদিকে আলোচনা দেখে আমার ক্রিকেট খেলার সময়ে আমাকে এবং আমার খেলোয়াড় বান্ধবীদের কী ধরনের পরিবেশ মোকাবেলা করতে হতো সেসব মনে পড়ে গেল।

খেলাধূলা ব্যাপারগুলো মেয়েদের বিষয় না- সোজাসাপটা এটাই মনে করা হয় আমাদের সমাজে। মেয়েরা বড়জোর পুতুল খেলা, এক্কা দোক্কা এসব খেলতে পারে, তবে ক্রিকেট ফুটবল তো একদমই না! ওসব ছেলেদের খেলা। আমার ক্রিকেট ক্লাবে মেয়ের সংখ্যা ছিল ছেলেদের ১০ ভাগের এক ভাগ। অধিকাংশ মেয়েদের খেলার সরঞ্জাম ঠিকমত ছিল না। না, আর্থিক সমস্যার জন্য নয়। মেয়ের খেলার পেছনে টাকা খরচ করাটা বাবা-মায়েরা অপচয় মনে করে বলেই তাদেরকে ঠিকমত সরঞ্জাম কিনে দেয়া হত না। অনেকেই তাদের বড় ভাইদের খেলার সরঞ্জাম নিয়ে খেলত।

খেলাশেষে মেয়েরা খেলোয়াড়ের পোশাকে বাড়ি ফেরার সময় নানান অশ্লীল মন্তব্য ও অঙ্গভঙ্গির মুখোমুখি হতো। এ অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে কয়েকজন বোরকা পরে মাঠে আসতো এবং খেলার পর বোরখা চাপিয়ে বাড়ি ফিরত। বাংলাদেশে একজন নারী খেলোয়াড়ের কী ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করে টিকে থাকতে হয়, সেসবই আমি নিজে দেখেছি বলে সেদিন নারী ফুটবলারদের সঙ্গে যা ঘটেছে তা আমাকে মোটেই অবাক করেনি। আমাদের দেশে শিক্ষিত-অশিক্ষিত অধিকাংশের কাছেই ‘মেয়েদের খেলাধূলা’ শব্দটি একটি হাস্যরসাত্মক শব্দ। “মেয়েরা খেলবে? খেলতে হলে শক্তি লাগে, মেয়েদের খেলার শক্তি আছে নাকি, মেয়েদের শরীর তো নরম। খেলার জন্য শক্ত বডি লাগে। কাঠের বল একবার লাগলেই তো তারা চিত”। ২০৬টি হাড় ভাঙার মত ব্যাথা সহ্য করে, পেলেপুষে বড় করে মুখ ফুটার পর তাদের মুখে এ ধরনের মন্তব্য শুনলে ইচ্ছা করে অণ্ডকোষ বরাবর লাথি মেরে বুঝিয়ে দেই, নরম কী জিনিস আর চিত হওয়া কাকে বলে।

একদল ছোটবেলা থেকেই ব্যাটবল হাতে নিয়ে মাঠে ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা উপভোগ করে, আরেকদল শত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে গিয়ে খেলতে আসে। তাহলে দুজনের খেলায় পার্থক্য তো থাকবেই। ক্রিকেটার সালমা খাতুনের একটি ইন্টারভিউ থেকে জেনেছি, তাদের প্র্যাকটিসের জন্য কোনও মাঠ পর্যন্ত বরাদ্দ নেই, ঠিকমত স্পন্সর পাওয়া যায় না। মেয়েদের কোনও খেলা টিভিতে দেখানো হয় না। ফেসবুকে পুরুষ ক্রিকেটারদের ছবির পোস্টে লাখ লাখ লাইক-কমেন্টের বন্যা। ‘মাশাল্লা ভাই, আপনি এভাবেই খেলে যান’ আর মেয়েদের খেলার কোনও ছবি পোস্ট করলে, ‘চেহারা তো কামের বেটির মত’ ‘**গুলা খুব সুন্দর’ ‘ওইগুলা এত বড় কেন?’। মেয়েরা কেমন খেলছে বা খেলায় উৎসাহ দেয়ার ধারে কাছেই কেউ যায় না! কারণ ‘মেয়েরা আবার কেমনে ক্রিকেট খেলবে?’

কিছুদিন আগে ঢাকায় মেয়েদের ম্যারাথন নিয়ে বিবিসির একটি রিপোর্টের কমেন্ট সেকশন দেখে বমির উদ্রেক হয়েছিল। মানুষের চিন্তাধারা এত নোংরা কীভাবে হয়? একজন সুস্থ মানুষ কীভাবে এমন মন্তব্য করতে পারে? প্রোফাইল ঘাঁটলে দেখা যাবে তাদের বেশিরভাগই শিক্ষিত, চাকরি জীবনে প্রতিষ্ঠিত, সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি। ভেবেছিলাম তাদের কমেন্টের স্ক্রিনশট নিয়ে যদি তাদের ওয়ালে পোস্ট করি তাহলে কেমন হবে? লজ্জা হবে নিশ্চয়ই? তারপর আবার ভাবলাম, লজ্জা হবে কীভাবে? আমাদের দেশের অধিকাংশ পুরুষেরা তো এমন চিন্তাধারাই লালন করে।

এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে কিছুদিন আগে। মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় রেজাল্ট ভালো করেছে। এইচএসসির ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং করানো হয়। যেহেতু স্টুডেন্টের তুলনায় পাবলিক ভার্সিটির সংখ্যা নগন্য, তাই বেশির ভাগ ছাত্ররা দেশের প্রায় সব ভার্সিটিতেই পরীক্ষা দেয়। আমার বান্ধবীরা এবার এইচএসসি দিয়েছে। অনেকেই জানিয়েছে, নিজেদের শহরের বাইরে পরীক্ষা দেয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে তাদের। ভার্সিটি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ঢাকার ভালো কোনও কোচিংয়ে ভর্তি করানো হচ্ছে না। মেয়ে মানুষ, কোথায় থাকবে, কী করবে এসব নিয়ে বাবা মায়ের চিন্তা। ছেলেরা কিন্তু বন্ধুবান্ধব দলবল সমেত কিংবা একা মেসে থেকে কোচিং করছে, নিজেদের শহর থেকে অনেক দূরে এসে সেরা কোচিং সুবিধাটুকু নিচ্ছে। আমার এক বান্ধবী জানালো, সে নিজ শহরের বাইরে অন্য শহরেও পরীক্ষা দিবে। যেখানে চান্স পাবে, সেখানেই পড়বে। তারা বাবা-মায়ের এতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু আপত্তি সমাজের মানুষের। আত্মীয়-প্রতিবেশিরা তার বাবা-মাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, মেয়েকে দূরে একা ছেড়ে পড়ানো উচিত না। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা সমস্যাটাই আমার কাছে প্রধান মনে হয়েছে। আবার অনেক বাবা মায়েরা পড়ালেখা চলাকালীন অথবা অনার্সটা পাশ হলেই ভালো পাত্র পেয়ে গেলে বিয়ে দেয়ার প্ল্যান করেন। তাই মেয়েদের ভালো ভার্সিটিতে ভর্তির ব্যাপারে আগ্রহী নন। এভাবে এইচএসসিতে দারুণ রেজাল্ট করা অনেক মেয়েরই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। ছেলেরা যখন ক্যারিয়ার শুরু করে, ঠিক সেসময়েই একটি মেয়ের ক্যারিয়ারের ইতি ঘটে বিয়ের মাধ্যমে।

চমক হাসানের ফেসবুক পেজে একটি পরিসংখ্যান পেলাম। সেটি অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭৪ লাখ। এদের মধ্যে নারী ২১%, পুরুষ ৭৯%। নারীর সংখ্যা এত কম শুনে অনেকেই রিপোর্টিকে নকল মনে করতে পারেন। রিপোর্টটির সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীর সংখ্যা যে ২১-২৫ শতাংশের বেশি নয়, এই তথ্যে কোনও ভুল নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীরা নানাভাবে হেনস্থার শিকার হয়। নকল ছবি, নকল আইডি বানিয়ে অনেক নারীদের বিব্রত করা হয়। আর নারীদের ইনবক্সে যা খুশি তাই লেখার স্বাধীনতা যেন সব পুরুষের মৌলিক অধিকার। এসব কারণে নারীদেশ একটি বড় অংশ ফেসবুক থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পছন্দ করেন। বাইরের জগতে নারীকে ধর্ষণ, তথাকথিত সম্ভ্রমহানির(?) ভয় দেখিয়ে বাইরের স্বাধীন পরিবেশ থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভার্চুয়াল জগতে সাইবার ক্রাইম করে নারীদের প্রযুক্তির সুবিধা লাভ থেকে বঞ্চিত করা হয়।

জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী ঠিক কী কারণে একমাত্র সংসদের স্পিকার আসনে বসলেই ঘোমটা দেন তার কারণ আমার এখনও জানা হল না। তাকে সংসদ ছাড়া অন্য কোনও জায়গায় ঘোমটা দিতে দেখা যায় না। তবে সংসদে মাথা ঢাকাটা জরুরি কেন? যখন বর্তমান রাষ্ট্রপতি সংসদের স্পিকার ছিলেন, তখন তো তাঁকে মাথায় টুপি দিয়ে বসতে দেখি নি। আর বিরোধী দলীয় নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী তো জনসমক্ষে কখনো ঘোমটা ছাড়া আসেনই না। কাজেই প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার সব নারী হওয়ায় নারীর ক্ষমতায়ন হয়ে গেছে বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার কোনও সুযোগ নেই।

সমস্যা যেমন আছে, সমাধানও আছে। সমস্যা নিয়ে লিখছি কিন্তু সমাধান নিয়ে লিখছি না কেন? কারণ সমস্যাগুলো এতছর ধরে চলতে চলতে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, সমস্যাগুলোকে মানুষ নিয়ম মনে করে। তাই সমস্যাগুলো নিয়ে বেশি লিখি, মানুষকে জানাতে যে এগুলো নিয়ম নয়, ‘সমস্যা’। সমস্যাকে সমস্যা মনে করলে সমাধান দ্রুত ঘটবে বলেই মনে করি।

সোমবার, ১৩ জুন, ২০১৬

ট্যাবুঃ সমকামিতা, পিরিয়ড!

১. আমেরিকার ফ্লোরিডায় সমকামীদের ক্লাবে মুসলমান জঙ্গির বন্দুক হামলায় নিহত ৫০, আহত ৫৩। ফ্রান্সে বোমা হামলা, বেলজিয়ামে হামলা, বাংলাদেশে প্রতিদিন সংখ্যালঘু-নাস্তিক-প্রগতিশীলদের হত্যা। প্রতিদিন এত এত মানুষের মৃত্যুর খবর, অসহনীয় হয়ে উঠছে দিন দিন। ধর্ম নামক একটি রূপকথা প্রতিষ্ঠা করতে এই হত্যাযজ্ঞ! ভাবা যায় না, একবিংশ শতাব্দীতেও মানুষ এসব রূপকথায় বিশ্বাস করে সহিংসতা করে বেড়াচ্ছে। অনেকে হয়তো বলবেন, এর পেছনে ধর্ম নয়, আছে রাজনীতি। আমেরিকা আলকায়দা-আইএস সৃষ্টি করেছে নিজেদের স্বার্থে, ধর্মের কোন দোষ নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কি ভারতের সৃষ্টি ছিল? বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ শুরু করার পরই ভারত বাংলাদেশকে সহায়তা করেছে। ঠিক একই ভাবে সব দোষ রাজনীতির উপর দিয়ে ধর্মকে মহান কিছু বানানোর উপায় নেই। সমকামীদের ক্লাবে হামলার প্রসঙ্গে যারা বলছে, ইসলামে হত্যার কথা বলা নেই। তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন সমকামীতার শাস্তি ইসলামে কী আছে। তাহলেই বুঝে যাবেন। প্রকৃতিতে ৪৫০ থেকে মতান্তরে ৪৮০ প্রজাতির মধ্যে সমকামীতা পরিলক্ষিত হয়। ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী আলফ্রেড কিন্সের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতি দশ জন ব্যক্তির একজন সমকামী। সমকামীতা প্রকৃতি বিরুদ্ধ কিছু নয়। এটিকে জটিলভাবে দেখে ধর্মের নিয়ম মেনে তাদেরকে আপনি হত্যা করছেন। পশুপাখিদের সমাজে ধর্ম নামক রূপকথাটির অস্তিত্ব নেই বলে, ধর্মের বর্বর নিয়ম মেনে তাদের কাউকে হত্যা করার প্রয়োজন হয় না। এদিক থেকে পশুপাখিরা আমাদের চেয়ে অনেকটাই সভ্য বলা যায়।

২. নাস্তিকদের ভিন্নমতের কারণে তাদেরকে খুন করাকে প্রশ্রয় দিয়েছি। এখন তাদের হত্যার লিস্ট আর নাস্তিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভিন্ন মতের জন্য যদি হত্যা করাকে আপনি প্রশ্রয় দেন, তাহলে একদিন হত্যাকারীরা আপনাকেও হত্যা করতে আসবে, কারণ হত্যাকারীদের সব মতের সাথে আপনিও একমত নন, একমত হওয়া সম্ভব না। একসময় দেখা যাবে হত্যাকারীরা নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা করছে, কারণ তাদের মধ্যেও মতের পার্থক্য দেখা যাবে। আমাদের সকলেরই বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের আলাদা মত রয়েছে। নাস্তিকদের মধ্যেও নানা বিষয়ে একেক জনের একেক মত, এ নিয়ে প্রতিনিয়ত অনলাইনে যুক্তি তর্ক হচ্ছে। আমি নিজের কথা বলতে পারি, আমি অনলাইনে এসে অনেক কিছু জেনেছি-শিখেছি এই যৌক্তিক তর্কে অংশ নিয়ে। দেশের চলমান অবস্থায়, প্রত্যেকেই আতংকিত। নাস্তিক হত্যার সময় আপনার নীরব সমর্থনই আপনাকে আজকের এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। আমরা আসলে একটা স্বার্থপর জাতি। যতদিন নিজের ঘাড়ে কোপ না আসে, ততদিন বুঝি না কোপের যন্ত্রণা।

৩. ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুললেই মন্তব্য আসে, ‘সকল মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত’। আমি স্বাধীনভাবে আমার মত প্রকাশ করব, আপনিও আপনার মত প্রকাশ করবেন। আপনার মত আমার কাছে যত জঘন্যই মনে হোক না কেন, আপনার মত প্রকাশে আমি বাধা হয়ে দাঁড়াব না, এটিই হলো বাকস্বাধীনতা, এখানেই আপনার মতের প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিহিত। অথচ আমরা মনে করি, আপনার মতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে, আমার মত প্রকাশ করলে আপনার অনুভূতিতে আঘাত লাগবে এজন্য এখন আমাকে চুপ থেকে আপনার মতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হবে!
ধার্মিকেরা অন্য ধর্মের নিন্দা শুনতে পছন্দ করে, নিজের ধর্ম নিয়ে কিছু বললেই অনুভূতিতে আঘাত লাগে। হিন্দুরা অনেকে বলে থাকেন, হিন্দু ধর্মে পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। কারও কিছু মানতেই হবে এরকম কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এই ধর্মে এমন কোন কথা বলা নেই যা সরাসরি ঈশ্বর বলেছেন, এই ধর্মের সব গ্রন্থই মুনিঋষিরা নিজেদের অর্জিত জ্ঞান থেকে লিখেছেন, যা সবাইকে মানতে হবে এমন কোন কথা নেই। এখন প্রশ্ন হল, যেহেতু তাদের নির্দিষ্ট কোনও নিয়ম বা বাধ্যবাধকতা নেই, কাজেই তারা তো নিজেদের মত নিজেরা স্বাধীন থাকতে পারে, 'সনাতন ধর্ম’কে ব্যানার করে আলাদা একটা গোষ্ঠী বানানোর কী প্রয়োজন?
আমরা অনেক সময় বলি, ‘লোকটা খুব ভালো’ প্রমাণ হিসেবে বলি, ‘৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন’ নামাজ রোজা করার সাথে কারোর ভালো হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। ধর্মের সাথে নৈতিকতার কোন সম্পর্ক নেই। নামাজ রোজা কাদের মোল্লা, কামারুজ্জমান সহ সকল যুদ্ধাপরাধীরাও করতো। নামাজ-রোজা জঙ্গিরাও করে। বরং সাধারণের চেয়ে একটু বেশিই করে। আমি বরং ধার্মিক ব্যক্তির কথা শুনলে সাবধান হই। কারণ তার নিশ্চিয়ই ধর্মানুভূতি নামক একটা তীব্র অনুভূতি আছে, যেটা কথায়-কথায় আহত হয়, আর এই অনুভূতি আহত হলে সে আমাকে খুন পর্যন্ত করতে পারে।
গতকাল পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে, ইফতারের আগে খাদ্যগ্রহণ করায় এক অশীতিপর বৃদ্ধ হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে পাকিস্তানের এক পুলিশ কনস্টেবল ও তার ভাই বেধড়ক পিটিয়েছে। এই ঘটনায় কনস্টেবল পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তার ভাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনা যদি বাংলাদেশে ঘটতো, তবে কাউকে গ্রেফতারের প্রশ্নই আসে না। উল্টো নির্ধারিত সময়ের আগে রোজাদারদের সামনে বিরিয়ানী খেয়ে ধর্মানুভুতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হতো।

৪. রোজার মাসে আরেকটা কমন প্রশ্ন, আপনি কি রোজা? মেয়েদেরকে সাধারণত এই ধরণের প্রশ্ন করা হয়। ‘না’ উত্তর শুনে ‘না’ এর কারণটা কল্পনা করে অনেকে সুখ পায়। কী নোংরা আমাদের মানসিকতা! পিরিয়ডের মত স্বাভাবিক একটি বিষয়কে ট্যাবু বানিয়ে রেখেছি।
আমাদের কলেজে স্টুডেন্টদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা ছিল। এক বান্ধবীর পিরিয়ড হলে আমরা মেডিকেলে গেলাম প্যাড আনতে। মেডিকেল রুমে ডাক্তারের সামনে বসে ছিল আমাদেরই একজন ছেলে সহপাঠী।তার মাথা ব্যথা জাতীয় কোন সমস্যা। নার্সকে জানালাম প্যাড লাগবে। উনি আমাদেরকে চুপ থাকতে বললেন। ওই ছেলে চলে যাওয়ার পরই নার্স প্যাড দিলেন। ওই ছেলের সামনে প্যাড হাতে নিতে তিনি লজ্জা পাচ্ছিলেন।
প্রতি মাসে মেয়েদের শরীরে একাধিক ডিম্বাণু বড় হতে থাকে এবং মাসের মাঝামাঝি সময়ে একটি পরিণত অবস্থায় স্ফুরিত হয়। ডিম্বাশয় থেকে বের হয়ে আসা ডিম্বাণু শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হলে ভ্রূণ তৈরি হয়, আর তা না হলে ডিম্বাণু ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে মিলিয়ে যায়। আবার নতুন ডিম্বাণু বড় হতে থাকে। ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণুটি বের হওয়ার সময় কিছুটা তরল পদার্থ বের হয়ে আসে, সেটিই পিরিয়ড। আর এই স্বাভাবিক ব্যাপারটা নিয়ে যারা মুচকি হাসতে পছন্দ করে, আপনি বরং তাদের অজ্ঞতা নিয়ে হাসতে পারেন। রোজা রেখেছেন কিনা জিজ্ঞেস করলে অনেকে বিব্রত হয়ে যান। সবচেয়ে ভালো হয় ধর্মমুক্ত হয়ে এসব ট্যাবুর বিরুদ্ধে যাওয়া, কারণ এসব ট্যাবু ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রের সৃষ্টি। যদি তা না পারেন অন্তত স্পষ্ট কন্ঠে জানান, আপনার পিরিয়ড চলছে। পিরিয়ড চলাকালে অনেকে পরিবারের সাথে সেহেরী খেতে উঠে। সারাদিন কিছু খায় না। কারণ পরিবারের বাবা-ভাইয়েরা যদি বুঝতে পারে যে, সে আসলে রোজা রাখে নি, তার পিরিয়ড চলছে। তবে এটা খুব লজ্জার ব্যাপার হবে। লজ্জা ভাঙ্গুন। পিরিয়ড নিয়ে লুকোচুরি খেলা বন্ধ করুন।

বৃহস্পতিবার, ২ জুন, ২০১৬

পুরুষানুভূতি ও তসলিমার নির্বাসনের ইতিকথা

'তসলিমা নাসরিন’ নামটির পাশে বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিকেরা ‘বিতর্কিত লেখিকা’ শব্দটি লিখে খুব আনন্দ পায়। তসলিমা নাসরিনের একটি বইও যে পড়ে নি, তাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, তসলিমা নাসরিন’কে সে চিনে কিনা, সে হয়তো বলবে, ‘ওই যে ইসলাম বিদ্বেষী বিতর্কিত লেখিকার কথা বলছেন?’ তসলিমা নাসরিনের লেখা পড়ে আমার কখনো মনে হয় নি তিনি বিতর্কিত কিছু লিখেছেন। আমার কাছে তাঁর আদর্শ, চিন্তা -চেতনা একেবারেই স্পষ্ট ও সঠিক মনে হয়েছে। অবশ্য যারা নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাসী নন, যারা নারীকে কেবল মা-বোন-বধূ রূপেই দেখতে পছন্দ করেন তাদের কাছে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়গুলো বেশ বিতর্কিতই মনে হবে। তবে আশার কথা, ইদানীং বেশকিছু পত্রিকা বিতর্কিত শব্দটির জায়গায় ‘জনপ্রিয় লেখিকা’ শব্দটি ব্যবহার করছে।

‘তসলিমা নাসরিন’ নামটির সাথে আমার পরিচয়, যখন আমি ক্লাস৫ এ পড়ি। ‘লজ্জা’ পড়েছিলাম তখন। তখন ‘হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা’ ব্যাপারটা আসলে কী, এ সম্পর্কে স্পষ্ট কোন ধারণা না থাকলেও জীবনের আটটি বছর গ্রামে কাটানোর কারণে গ্রামে হিন্দু পাড়ার প্রতি মুসলমানদের দৃষ্টি ভঙ্গি কেমন হয়, সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা ছিল।

১৯৯৩ সালে সরকারী এক তথ্যবিবরনীর মাধ্যমে তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’ বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। সেই তথ্য বিবরণী অনুযায়ী, জনমনে বিভ্রান্তি ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অঙ্গনে বিঘ্ন ঘটানো এবং রাষ্ট্র বিরোধী উসকানিমূলক বক্তব্যপ্রকাশিত হওয়ার জন্য ‘লজ্জা’ নামক বইটির সকল সংস্করণ সরকার বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। প্রকৃতপক্ষে মৌলবাদীদের আন্দোলনের কাছে মাথা নত করা সরকার, মৌলবাদীদের খুশি করতে বইটিকে বাজেয়াপ্ত করে।

‘লজ্জা’ বইটি ছিল মূলত তথ্য ভিত্তিক বই। ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর মুসলমানদের বর্বরতার ঘটনাগুলোই লেখক তাঁর লেখায় চিত্রিত করেছিলেন। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হলেও পরবর্তীতে ৩০টিরও বেশি ভাষায় বইটি অনূদিত হয়।

আরও একটু বড় হয়ে পড়েছিলাম ‘নিমন্ত্রণ’ নামের বইটি। ‘নিমন্ত্রণ’ বইটির প্রথম অংশে দুজন মানুষের প্রেমের কথা থাকলেও, এই গল্পের শেষটি ছিল খুবই বাস্তব এবং নির্মম। শেষ অংশটিতে ছিল, প্রেমিকা কীভাবে প্রেমিকের সাথে দেখা করতে গিয়ে প্রেমিক ও প্রেমিকের বন্ধুদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছিল সেই কথা। এই সেদিনও খবরে দেখলাম, ঢাকায় প্রেমিকের সাথে দেখা করতে গিয়ে প্রেমিক ও তার বন্ধুদের দ্বারা প্রেমিকা ধর্ষিত হয়েছে। এসব ঘটনা অহরহ ঘটছে।

গল্পে প্রেমিক প্রেমিকার প্রেম থাকবে, প্রেমিকাকে হিরো প্রেমিক সব বিপদ থেকে রক্ষা করছে, এধরণের কাহিনীর লেখকরাই সমাজে হাত তালি পাবেন। কিন্তু সমাজের বাস্তব চিত্র যেই লেখকের লেখায় উঠে আসবে, তিনি হবেন নিষিদ্ধ। কারণ আমাদের নিজেদের বাস্তব রূপটা যে এতটাই কুৎসিত, সেটা আমরা নিজেরাই মেনে নিতে পারি না।
এরপর পড়ি, ‘অপরপক্ষ’। নারীকে মায়ের জাত বলে, মাতৃত্বের জন্য নারীকে মহান করে দেখানো হয়। অথচ, পিতার পরিচয় ছাড়া সন্তানের কোন পরিচয় নেই, সে নাকি হয় ‘জারজ সন্তান’। সমাজের এই ভণ্ডামীটা ‘অপরপক্ষ’ নামক উপন্যাসে অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতা আমার ভালো লাগে না, বেশির ভাগ কবিতার বইগুলোতে কেবল প্রেম আর প্রেম। বাস্তবে তো নারীর প্রতি পুরুষের প্রেম কোথাও দেখি না। দেখি নারীর শরীরটির প্রতি পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি। ‘নির্বাচিত নারী’ নামক কবিতার বইটিতে বাস্তবভিত্তিক অসাধারণ কিছু কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

‘নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য’ বইটির ভূমিকায় লেখক লিখেছেন, ‘নিজেকে এই সমাজের চোখে নষ্ট বলতে আমি ভালোবাসি। কারণ এ-কথা সত্য যে, যদি কোনও নারী নিজের দুঃখ-দুর্দশা মোচন করতে চায়, যদি কোনও নারী কোনও ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের নোংরা নিয়মের বিপক্ষে রুখে দাঁড়ায়, তাঁকে অবদমনের সকল পদ্ধতির প্রতিবাদ করে, যদি কোনও নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সজাগ হয়, তবে তাকে নষ্ট বলে সমাজের ভদ্রলোকেরা। নারীর শুদ্ধ হবার প্রথম শর্ত নষ্ট হওয়া। নষ্ট না হলে এই সমাজের নাগপাশ থেকে কোনও নারীর মুক্তি নেই। সেই নারী সত্যিকার সুস্থ ও শুদ্ধ মানুষ, লোকে যাকে নষ্ট বলে’। ঠিকই তো, প্রতিবাদী কোন নারীকে দমিয়ে দিতে প্রথম যেই শব্দগুলো তার দিকে ছুড়ে দেয়া সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ‘নষ্ট মেয়ে’।

‘যাবো না কেন? যাবো’ বইটির নামের মধ্যেই রয়েছে একপ্রচন্ড সাহসীকতা। ‘নির্বাচিত কলাম’ বইটি মূলত লেখকের নব্বইয়ের দশকের পুরুষতন্ত্র ও ধর্মের ভন্ডামী নিয়ে লেখা অসাধারণ কলামগুলো নিয়ে সাজানো হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে, লেখক হিসেবে তসলিমা নাসরিন ছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। ৭১এর পর বাংলাদেশে নাস্তিকতা ও নারীবাদের হাতে খড়ি হয়েছে তসলিমা নাসরিনের মাধ্যমে। সেসময় তিনি একাই তার ‘অস্ত্র’ (কলম) তুলে ধরেছিলেন, ধর্মের বিরুদ্ধে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে। অন্য কোন লেখককে তখন এধরণের বিপদজনক লেখা লিখতে দেখা যায় নি। পরে অবশ্য তসলিমা নাসরিনের জনপ্রিয়তাকে হিংসে করে অনেকেই নারীবাদী বই লেখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু নিজে নারী হয়ে, নিজের সাথে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতা, নারীর দুঃখ কষ্টগুলো অনুভব করে লেখা, আর জনপ্রিয়তা লাভের জন্য, নিজের চরিত্রে চরম পুরুষতান্ত্রিকতা রেখে নারীবাদ লেখা তো আর এক হয় না।

‘ছোট ছোট দুঃখ কথা’, ‘দুঃখবতী মেয়ে’, ‘নারীর কোনও দেশ নেই’, ‘নিষিদ্ধ’, ‘শোধ’, ‘বন্দিনী’ বইগুলো পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাঁর বইগুলো আমাকে শিখিয়েছে অনেক কিছু। সমাজের নিয়মনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের অধিকারের পক্ষে লড়াই করার সাহসটুকু আমি সেখান থেকেই পেয়েছি।

তসলিমা নাসরিনের আত্মজীবনীর ৭টি খন্ড পড়লেই বোঝা যায়, লেখক হিসেবে তিনি কতটা সৎ। যদিও ৭টি খণ্ডের মধ্যে ৪টিই বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। আত্মজীবনীতে নিজের ভুল ত্রুটি গুলো লিখতে কুন্ঠাবোধ করেন নি। পরবর্তীতে সেসব ভুলগুলো সাহসের সাথে মোকাবেলা করার কথাও তিনি লিখেছেন। ‘উতল হাওয়া’ বইটিতে রুদ্রের সাথে প্রেমের ঘটনা পড়ে আমরা সবাই বলেছি, ‘আহা কী প্রেম!’ রুদ্রের নষ্টামিগুলো পড়ে অনেকে বলেছে, ‘নিজের বাসর ঘরের কাহিনী কেউ এভাবে রাখঢাক না রেখে বর্ণনা করে! ছি কী অশ্লীল!’ অথচ কারও চোখে পরে নি, বাসর ঘরে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে আসা মেয়েটির স্বপ্ন ভঙ্গের কষ্ট। ‘ক’ বইটি আমার কাছে মনে হয়েছে তসলিমা নাসরিনের আত্মজীবনীগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ট একটি বই। এই বইয়ে অন্য বইগুলোর মত নারীর জীবনের কান্না-দুঃখ-কষ্টগুলোর চেয়েও বেশি ফুটে উঠেছে বাধা উপড়ে সামনে এগিয়ে চলার সাহসীকতা। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, ‘মেয়েবেলা’, ‘উতল হাওয়া’ বইগুলো পড়ে যারা হাততালি দিয়েছেন, তাদের অনেকেই আবার এই বইটির বিরুদ্ধে গেছেন। নারী কেবল পুরুষতান্ত্রিক শেকলে বন্দী হয়ে যন্ত্রণায় কাঁদবে, প্রেমিককে সমস্ত প্রেম উজাড় করে দিয়ে প্রতারিত হয়ে হতাশায় ডুবে থাকবে এসব দেখতে আমাদের সমাজ অভ্যস্ত হলেও নারী মেরুদণ্ড সোজা করে উঠে দাঁড়িয়েছে, সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, এটাতে অভ্যস্ত নয় আমাদের সমাজ। তাই সমাজের প্রগতিশীল পুরুষেরা এই বইয়ের বিরুদ্ধে গেছে। সবচেয়ে অবাক হয়েছি বাংলাদেশে প্রথাবিরোধী লেখক হিসেবে পরিচিত হুমায়ুন আজাদের বক্তব্যটি পড়ে। তিনি বলেছেন, ‘সম্প্রতি প্রকাশিত 'ক' বইটি সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পড়ে আমার মনে হয়েছে, এটি একটি পতিতার নগ্ন আত্মকহন অথবা একজন নিকৃষ্টতম জীবনের কূরুচিপূর্ন বর্ণনা’। তাঁর এই বক্তব্যতেই বুঝতে পেরেছি, তিনি নারীবিরোধী প্রথাগুলো খুব যত্নে নিজের মধ্যে লালন করতেন।

‘ক’ বইটি নিয়ে বাংলাদেশের আরও কয়েজন বুদ্ধিজীবীর বক্তব্য পড়ে তাদের নোংরা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় পেয়েছি।

ইমদাদুল হক মিলন, সাহিত্যিক
ও নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই। তার বই আমি পড়িনি। দু একজনের কাছে শুনেছি কী লিখেছে। কিন্তু যাই লিখুক, আমি তাতে ইন্টারেস্ট ফিল করছি না। বাদ দিন ওসব।
মানবজমিন, ১ নভেম্বর, ২০০৩

সৈয়দ শামসুল হক, সাহিত্যিক
তসলিমা আমার চরিত্র হনন করেছে। মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। ৫২ বছরে লেখক হিসেবে আমি যে সম্মান কুড়িয়েছিলাম তা আজ ধুলিস্যাৎ। নিশ্চয়ই এর পিছনে কিছু রহস্য আছে। না হলে তিনি দেশের এত সম্মানিত লেখক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে লিখতে সাহস পেতেন না। আমার মনে হয়েছে, প্রতিবাদ করা দরকার। তাই মামলা ঠুকে প্রতিবাদ জানালাম।
সংবাদ প্রতিদিন, ১০ নভেম্বর, ২০০৩

আসাদ চৌধুরী, সাহিত্যিক
‘ক’ বইটি আমি পড়িনি। তবে যার বিরুদ্ধে লেখা হোক না কেন, লেখকের ওপর পাঠকের কতটুকু আস্থা আছে তা অবশ্য মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ ব্যক্তি সমাজ বিশাল জনগোষ্ঠি নিয়েই সাহিত্য, কোনও লাম্পট্যের নির্লজ্জ বর্ণনা কখনও সাহিত্য হতে পারে না।
আজকের কাগজ, ১১ নভেম্বর, ২০০৩

তসলিমা নাসরিনের কোনও বই ঢাকার কয়েকটি মার্কেট ছাড়া বাংলাদেশের আর কোথাও পাওয়া যায় না। আমি তসলিমা নাসরিনের যেসকল বই পড়েছি, তার বেশিরভাগই বুক শেল্ফের পুরাতন বইয়ের তাকে ছিল। বাকিগুলো ঢাকা থেকে অর্ডার দিয়ে আনিয়েছি। দেশের কোনও দোকানে গিয়ে তসলিমা নাসরিনের বই চাইলে, আপনাকে প্রথমেই দোকানী জানিয়ে দেবে, ওই লেখকের বই তারা বিক্রি করে না। ফ্রিতে একটি উপদেশও দিয়ে দিতে পারে, ওই নাম যেন আপনি মুখে এনে আপনার মুখকে অপবিত্র না করেন। বাংলাদেশে ‘তসলিমা নাসরিন’ নামটি একটি নিষিদ্ধ নাম। নব্বইয়ের দশকে যিনি ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তিনিই কিনা এখন দেশে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ! আপনার কী ধারণা এর পিছনে দায়ী মৌলবাদীরা? মোটেই না। এজন্য দায়ী, ভোটের রাজনীতি আর সুবিধালোভী হীনচরিত্রের মানুষগুলো। মৌলবাদীদের কোনও ক্ষমতা ছিল না তসলিমা নাসরিনকে দেশ থেকে বের করার। তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছিল মৌলবাদ তোষণকারী সরকার।

তসলিমা নাসরিনের আত্মজীবনী চতুর্থ খণ্ডটি মূলত ১৯৯৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পর ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো নিয়ে।

তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার(বিএনপি) ধর্মানূভুতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগ তুলে তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা করে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি কোরান সংশোধনের কথা বলেছেন। অথচ তিনি শরিয়া নামক বর্বর আইনটি বাতিলের কথা বলেছিলেন, কোরান সংশোধনের কথা নয়। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি হলে তিনি আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। এ নিয়ে দৈনিক ভোরের কাগজে ক'জন বিশিষ্ট নাগরিকের মন্তব্য-

হুমায়ুন আজাদ, কবি, অধ্যাপক
নাসরিন নামের একটি তুচ্ছ বস্তুকে বাংলাদেশের অপদার্থ সরকার, আনন্দবাজার আর হিন্দু মুসলমান মৌলবাদীরা আন্তর্জাতিক বস্তুতে পরিণত করেছে। এটা এখনকার সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার।...এই সময়ের একটি বেশ হাস্যকর ব্যাপার হচ্ছে, নাসরিনের মত একটি তুচ্ছ বস্তুকে নিয়ে সারা পৃথিবীর মেতে ওঠা। পশ্চিম ইওরোপ তার জন্য দরজা খুলে দিয়েছে।

আমহদ ছফা, লেখক
তসলিমা নাসরিন ভারতের সৃষ্টি।...তসলিমা এবং তাকে যারা সমর্থন করে তারা মৌলবাদকে এমনভাবে উস্কে দিয়েছে, স্বাধীন চিন্তাভাবনার লোক মস্ত বিপদে পড়ে গেছেন।...তসলিমা এবং তার সমর্থকদের অবিবেচনার কারণে দেশের সমস্ত চিন্তাশীল ব্যক্তি একটি সঙ্কটের সম্মুখে পড়েছে।...একটি অমঙ্গলের শক্তি।

ফরিদা রহমান, সাংসদ, বিএনপি
ঐসব আজেবাজে লেখা ছেড়ে দিয়ে তসলিমার মাফ চাওয়া উচিত। তারপর সাধারণ জীবনযাপন করা উচিত।... জনগণ যদি ক্ষমা করে তারপর আমরা সাধারণ মহিলারা যেভাবে জীবনযাপন করি সেভাবে তার জীবনযাপন করতে হবে।

সুত্রঃ সেই সব অন্ধকার, তসলিমা নাসরিন।

সেই সময় মৌলবাদীদের তোষণ না করে যদি প্রকাশ্যে তসলিমা নাসরিনের মাথার মূল্য নির্ধারণকারী ধর্মীয় গুরুকে শাস্তির আওতায় আনা হতো, সুবিধাবাদী লেখক প্রগতিশীলেরা যদি সেসময় হিংসের বশবর্তী না হয়ে, সবাই এক হয়ে সেসব মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন, সরকারের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেন তবে হয়তো আজকের এই দিন আমাদের দেখতে হতো না। এই প্রগতিশীল লোকেদের অনেকেই পরবর্তীতে মৌলবাদীদের প্রশয় দেয়ার ফল ভোগ করেছেন এবং করছেন। সেই ১৯৯৪ সাল থেকেই তো মৌলবাদীরা প্রশ্রয় পেতে পেতে আজকের এই রূপ নিয়েছে। এজন্য মৌলবাদীরা নয়, বরং দায়ী সুবিধাবাদীরা- এ নিয়ে কারও সন্দেহ আছে কী?

বর্তমানে ব্লগার-লেখক-প্রকাশক ইত্যাদি প্রগতিশীল মানুষদের হত্যার বিরুদ্ধে দেশের বুদ্ধিজীবিদের তেমন কোন প্রতিবাদ লক্ষ্য করা না গেলেও, লক্ষ মাইল দূরে বসে যিনি একটি আধুনিক প্রগতিশীল রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেন, তিনি ঠিকই তাঁর কলমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে, সরকারের ভূমিকার বিরুদ্ধে।

অথচ এখনও প্রতিনিয়ত আমরা ‘তসলিমা নাসরিন’ নামটিকে অত্যন্ত সচেতন ভাবে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে মুক্তচিন্তা, বাক স্বাধীনতার কথা বলি। যিনি বাংলাদেশে নাস্তিকতা ও নারীবাদের সূচনা করেন, যিনি ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লেখার কারণে আজ ২১ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশে নিষিদ্ধ হয়ে আছেন, তাঁকে বাদ দিয়ে মুক্তচিন্তা করাটা আদৌ ফলপ্রসু হয়েছে বা হচ্ছে? যে মুক্তচিন্তা পুরুষতান্ত্রিকতা মুক্ত নয়, সে চিন্তাকে আমি মুক্তচিন্তা বলতে পারি না। এটা এক ধরনের ভন্ডামীর নামান্তর।তারা প্রকৃতপক্ষ ধর্মের কুসংস্কার থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলেও, নারীবিরোধী সংস্কারগুলো থেকে মুক্ত হতে পারেননি।

বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের তসলিমা বিষয়ে এমন নীরবতা আমাকে অবাক ও ক্ষুব্ধ করেছে। তাই ২০১৪ সালে, আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে ‘তসলিমা পক্ষ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ খুলি। তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত মিথ্যা অপপ্রচারগুলো সম্পর্কে মানুষকে জানানো, তসলিমা নাসরিনের লেখাগুলো মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়াই এই পেজের উদ্দেশ্য। পরবর্তীতে আমরা তসলিমা নাসরিনের জন্মদিনে, ‘তসলিমা দিবস’ উদযাপন করি। এছাড়াও তসলিমা পক্ষের আয়োজনে মুক্তচিন্তার পক্ষের মানুষদের নিয়ে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি প্রোগ্রাম হয় শাহবাগে। বর্তমানে দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে, অফলাইন প্রোগ্রামের ঘোষণা না দিয়ে অনলাইনেই তসলিমা নাসরিনের লেখা গুলো নিয়ে ছোট ছোট অনলাইন পোষ্টার বানিয়ে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, ধর্মান্ধ সমাজ নারীকে নানা ভাবে দমন করে এসেছে। নারীর কথাগুলো যাতে উচ্চারিত না হয় সে জন্যই উপামহাদেশের শ্রেষ্ঠ নারীবাদী লেখককে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নিষিদ্ধ করেছে। তসলিমা নাসরিনকে তাঁর নিজ ভূমি নির্বাসন দণ্ড দিলেও সভ্য দেশগুলো তাঁকে নানা ভাবে সম্মানিত করেছে। তসলিমা’কে নিষিদ্ধ করাতে তসলিমার খুব বেশি ক্ষতি না হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। তসলিমা নাসরিনের নির্বাসন কেবল একজন মানুষ তসলিমার নির্বাসন নয়, এটি মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা আর মানবাধিকারের নির্বাসন।

যেসব কথা বলা নিষেধ, সেসব কথাই তিনি জোর গলায় বলেছেন। যে শব্দ উচ্চারন করা মানা ছিল, সে শব্দই তিনি বারবার উচ্চারন করেছেন। আজ আমরা সেসব শব্দের-ভাষার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। তসলিমা নাসরিন এদেশের নারীদের কথা বলা শিখিয়েছেন, বাধা উপড়ে এগিয়ে চলতে শিখিয়েছেন। আজ আমরা কথা বলতে পারি, প্রতিবাদ করতে পারি। আমরা ভুলি নি তসলিমা নাসরিনকে। নিষিদ্ধ নামটিই আমরা গর্বের সাথে উচ্চারন করি। কারন এই নিষিদ্ধ নামেই আমরা আমাদের শক্তি খুঁজে পাই, প্রতিবাদ করার সাহস পাই।